থামল ইরান-ইসরায়েল হামলা-পাল্টা হামলা

গত এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর এই প্রথম সরাসরি মুখোমুখি সংঘাতের পর ইরান ও ইসরায়েল একে অপরের ওপর হামলা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সোমবার (৮ জুন) সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘এই মুহূর্তে’ হামলা বন্ধ থাকলেও ইরান ও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের লড়াই ‘এখনো শেষ হয়নি’।

এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী জানায়, ইসরায়েলকে একটি ‘তীব্র জবাব’ দেওয়ার পর তারা তাদের সামরিক অভিযান স্থগিত করেছে। একই সঙ্গে তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, ইসরায়েল যদি লেবাননসহ অন্য কোথাও পুনরায় কোনো হামলা চালায়, তবে এর চেয়েও ‘আরও ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপ’ নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, বৈরুতে ইসরায়েলি হামলার প্রতিশোধ হিসেবে গত রোববার ইসরায়েল অভিমুখে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইরান। এর জবাবে সোমবার ভোরে ইরানের অভ্যন্তরে বেশ কিছু সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে কড়া ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে পুনরায় যুদ্ধ জড়ালে ইসরায়েলকে একাই লড়তে হতে পারে। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি বলেছি, বিবি (নেতানিয়াহু), তোমাকে আরও সতর্ক হতে হবে, অন্যথায় খুব শীঘ্রই তুমি সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়বে।’

এর আগে ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বৈরুতে হামলা চালানোয় ইসরায়েলের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন ট্রাম্প। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প মন্তব্য করেন, ওয়াশিংটন ইরানের সাথে যে চুক্তিই করুক না কেন, নেতানিয়াহুকে তা মেনে নিতেই হবে। কারণ হিসেবে ট্রাম্প বলেন, ‘এখানে সব সিদ্ধান্ত আমার, তার (নেতানিয়াহু) নয়।’

বিবিসির সঙ্গে এক ফোনালাপে অবশ্য ট্রাম্প অস্বীকার করেছেন যে নেতানিয়াহু তার নির্দেশ অমান্য করেছেন। ট্রাম্প বলেন, ‘না, না। আমি বলার আগেই তাদের যুদ্ধবিমানগুলো উড্ডয়ন করেছিল।’ হোয়াইট হাউস নিশ্চিত করেছে, সংকট নিয়ে ট্রাম্প নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। একজন ইসরায়েলি কর্মকর্তাও নিশ্চিত করেছেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের অনুরোধেই ইসরায়েল হামলা স্থগিত করেছে।

নেতানিয়াহুকে কীভাবে রাজি করালেন- জানতে চাইলে ট্রাম্প নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যাল-এ লেখেন, ‘আমি শুধু বলেছি আমাদের বুদ্ধি খাটানো উচিত। আমরা খুব শক্তিশালী ও ভালো একটি চুক্তির কাছাকাছি আছি, যেখানে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না। ইসরায়েল ও ইরান এখন অবিলম্বে একটি যুদ্ধবিরতি চাইছে।’

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আমি তাকে (নেতানিয়াহু) কিছু করতে বললে সে তা শোনে।’

অন্যদিকে সোমবার এক টেলিভিশন ভাষণে নেতানিয়াহু বলেন, তিনি ট্রাম্পকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, ‘ইসরায়েলের আত্মরক্ষার পূর্ণ অধিকার রয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আমরা তা প্রয়োগ করছি।’

যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লাইটার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, বিশ্বের কোনো আত্মমর্যাদাশীল দেশ এমন হামলা সহ্য করবে না, ইসরায়েলও করবে না।

ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের মতে, রবিবারের পর সোমবার সকালেও জেরুজালেম এবং ইসরায়েলের মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চল লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইরান। জবাবে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমের শহর মাহশাহরের একটি পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে দ্বিতীয় দফায় বিমান হামলা চালায়। ইসরায়েলের দাবি, সেখানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের রাসায়নিক তৈরি হতো।

ইরানের জরুরি সেবা সংস্থার প্রধান জাফর মিয়াশফার বার্তা সংস্থা তাসনিম-কে জানান, মাহশাহরে ১৪ জন এবং তেহরানে ১ জন আহত হয়েছেন।

এদিকে লেবাননের দক্ষিণ অঞ্চলের টায়ার শহরে সোমবার ইসরায়েলি হামলায় ৫ জন নিহত ও ৮ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। রেড ক্রসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আহতদের মধ্যে তাদের ৪ জন উদ্ধারকর্মী রয়েছেন। এর জবাবে হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, সোমবার সকালে তারা দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক যান ও সেনাদের লক্ষ্য করে রকেট হামলা চালিয়েছে।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর এই যুদ্ধ শুরু হয়। ইরান এর জবাবে ইসরায়েল এবং মার্কিন ঘাঁটি থাকা উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালালে যুদ্ধ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ করে দিলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়।

২ মার্চ খামেনি হত্যার প্রতিশোধে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট হামলা শুরু করলে লেবাননও এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ইসরায়েল পাল্টা বিমান হামলাসহ লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে স্থল অভিযান শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও লেবানন সরকারের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও হিজবুল্লাহ তা প্রত্যাখ্যান করে ইসরায়েলি সেনাদের পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানায়। ফলে সংঘাত থামেনি।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে লেবানন ও ইরানের সাথে একটি সামগ্রিক চুক্তি করার লক্ষ্যে ইসরায়েলকে সামরিক অভিযান সীমিত করার জন্য চাপ দিচ্ছিল ওয়াশিংটন। তবে সোমবার সন্ধ্যায় ইরানের শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাকের কলিবফ এক টেলিগ্রাম পোস্টে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরানের বন্দরে নৌ-অবরোধ এবং যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনই সাম্প্রতিক উত্তেজনার মূল কারণ।’ 

তিনি আরও বলেন, আমরা আগ বাড়িয়ে যুদ্ধ বা আলোচনা করতে যাচ্ছি না। তবে আমরা আমাদের সুবিধাজনক সময়েই লড়ব এবং আলোচনা করব।

ইরানের মার্টার্স ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, এই যুদ্ধে ইরানে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩ হাজার ৪৬৮ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইরানের মানবাধিকার সংস্থা (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় নিহতের সংখ্যা ৩,৬৩৬ জন, যার মধ্যে ১,৭০১ জনই বেসামরিক নাগরিক।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে ৩ হাজার ৬১৩ জন নিহত হয়েছেন (যার মধ্যে সেনা ও বেসামরিক নাগরিক উভয়ই রয়েছে)।

ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের দাবি, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলে ২০ জন বেসামরিক নাগরিক এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া হিজবুল্লাহর সাথে লড়াইয়ে সীমান্ত এলাকায় ৩০ জন ইসরায়েলি সেনা ও ৪ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।

বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের হামলায় আরও ২৯ জন নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় প্রশাসন নিশ্চিত করেছে। যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৭ জন পারস্য উপসাগরে ইরানের হামলায় প্রাণ হারান।

সূত্র: বিবিসি