পুতিনের ‘যুদ্ধ অর্থনীতি’ ধসিয়ে দিতে ইইউর নতুন চাল

ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে রাশিয়ার অর্থনীতির ওপর দেড় ট্রিলিয়ন (১ লাখ ৫০ হাজার কোটি) ডলারের যে ধাক্কা লেগেছে, তার পরিধি আরও বাড়াতে নতুন নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনা করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।

সোমবার (৮ জুন) সাইপ্রাসে ইইউভুক্ত দেশগুলোর প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান জোটের পররাষ্ট্র নীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস। তিনি জানান, ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানকে সমর্থন জোগানো আরও ৮০টি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির ওপর নতুন বিধি-নিষেধ আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করছে ইইউ।

কাজা কালাস বলেন, রাশিয়ার ‘সামরিক শিল্প খাত, মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী এবং প্রোপাগান্ডাকারীদের (অপপ্রচারকারী)’ লক্ষ্য করে এই ৮০টি নতুন নাম প্রস্তাব করা হয়েছে।

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার ইতোমধ্যেই আনুমানিক ১.২ থেকে ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে উল্লেখ করে কালাস বলেন, ‘পুতিন অর্থ, সৈন্য এবং যুদ্ধক্ষেত্রের গতি হারাচ্ছেন। আর ঠিক এই কারণেই রাশিয়া ইউক্রেনের বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা জোরদার করছে।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘ইটের পর ইট খসিয়ে আমরা রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থনীতির ভিত্তি ধসিয়ে দিচ্ছি।’

প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের এই বৈঠকে ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহকারী দেশগুলোর ক্ষতিপূরণ বাবদ বরাদ্দের জন্য পূর্বে বিতর্কিত ৬৬০ কোটি ইউরো (৭৬০ কোটি ডলার) তহবিলের ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা হয়।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত ভিক্টর অরবান গত এপ্রিলে ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর নতুন প্রধানমন্ত্রী পিটার মাগিয়ারের অধীনে হাঙ্গেরি তার আগের অবস্থান থেকে অনেকটাই সরে এসেছে। দেশটি ইইউর অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে জানিয়েছে যে, এই তহবিলের বিপক্ষে দীর্ঘদিন ধরে তারা যে অবস্থান নিয়েছিল, তা প্রত্যাহার করে নেবে।

কালাস প্রস্তাব করেছেন যে, এই তহবিলটি কেবল সদস্য দেশগুলোর অতীতের অস্ত্র সরবরাহের ক্ষতিপূরণ হিসেবেই ব্যবহার করা উচিত নয়; বরং যৌথ অস্ত্র ক্রয় এবং ইইউর সামরিক সহায়তা অর্থায়নেও এটি ব্যবহার করা উচিত।

যুক্তরাষ্ট্র যখন রাশিয়ার প্রতি তাদের কড়া অবস্থান কিছুটা শিথিল করেছে, ঠিক তখনই মস্কোর ওপর চাপ বাড়াতে তৎপর হয়েছে ইইউ। গত মার্চ মাসেই জোটটি ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং সম্পদ ফ্রিজ করাসহ প্রায় ২ হাজার ৬০০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা বাড়িয়েছে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে সমুদ্রে ট্যাঙ্কারে বোঝাই থাকা রুশ তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য কেনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশকে নিষেধাজ্ঞায় ছাড় দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই মার্কিন সিদ্ধান্তের কারণে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে বাইডেন প্রশাসন।

কাজা কালাস যখন এই মন্তব্য করছিলেন, ঠিক তখনও ইউক্রেনে রাশিয়ার প্রাণঘাতী হামলা অব্যাহত ছিল।

ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জাপোরিঝিয়া অঞ্চলের গভর্নর ইভান ফেদোরভ জানান, সোমবার (৮ জুন) ভোরের দিকে রুশ হামলায় ৫ জন নিহত এবং ১৪ জন আহত হয়েছেন। এতে বিভিন্ন অবকাঠামো, আবাসিক ভবন ও যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সোমবার (৮ জুন) সন্ধ্যায়ও ওই অঞ্চলে হামলার আশঙ্কা কাটেনি বলে টেলিগ্রামে এক বার্তায় জানান ফেদোরভ।

এদিকে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের প্রস্তাব দেওয়ার কয়েকদিন পর, লন্ডনে ইউরোপীয় নেতাদের সাথে বৈঠক শেষ করে দেশে ফিরেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।

তবে সোমবার কালাস স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসার সঠিক সময় এখনও আসেনি। তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি সেই পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাশিয়াকে এমন একটি পরিস্থিতিতে ফেলতে আমাদের কৌশলগত ধৈর্য ধরতে হবে, যাতে তারা সত্যিই আন্তরিকভাবে আলোচনা করতে বাধ্য হয়।’

সূত্র: আল-জাজিরা