লেবাননজুড়ে ইসরায়েলের ব্যাপক তাণ্ডব, নিহত ১৪

লেবাননে যুদ্ধবিরতির মধ্যেই নতুন করে চরম উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। রবিবার বৈরুতে ইসরায়েলি হামলার পর ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে তীব্র গোলাগুলি ও ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময় হয়েছে। এরপরই দক্ষিণ লেবাননজুড়ে চালানো ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত এবং কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছেন। গতকাল সোমবার (৮ জুন) এই রক্তক্ষয়ী হামলার ঘটনা ঘটে।

এদিকে, ইসরায়েল যদি লেবাননে তার সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখে, তবে দেশটিকে ‘দমনমূলক ব্যবস্থা’র মুখোমুখি হতে হবে বলে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। গত ৮ এপ্রিল ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর হওয়ার পর থেকে এটিকে সবচেয়ে বড় সংঘাত ও উত্তেজনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার (এনএনএ) বরাত দিয়ে জানা গেছে, দক্ষিণ উপকূলীয় শহর টায়ারের একটি রেড ক্রস কেন্দ্রের কাছে ইসরায়েলি হামলায় চারজন প্যারামেডিকসহ ৫ জন নিহত এবং আটজন আহত হয়েছেন। এই বোমাবর্ষণে টায়ারে অবস্থিত একটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট (বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান) ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কর্তৃপক্ষ শহরের অবশিষ্ট বাসিন্দাদের গণজমায়েত এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।

অন্যদিকে, সিডন জেলার আল-মারওয়ানিয়াহ এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় এক শিশুসহ দুজন নিহত এবং চার নারীসহ আরও ১০ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া নাবাতিয়াহ জেলার জেফতা এলাকায় তৃতীয় এক হামলায় এক সিরীয় শিশু ও এক নারীসহ সাতজন নিহত এবং আটজন আহত হন। পাশাপাশি নিকটবর্তী তুলিন গ্রামেও কামানের গোলাবর্ষণ করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।

দক্ষিণ লেবাননে আক্রমণকারী ইসরায়েলি সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। গোষ্ঠীটি দাবি করেছে, তারা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বোফোর্ট দুর্গের কাছাকাছি এলাকাসহ ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর ১৬টি অভিযান চালিয়েছে। দুর্গের পাশের ইয়োহমোর আল-শাকিফ গ্রামে ইসরায়েলি বাহিনীর দুটি সামরিক বুলডোজার ধ্বংস এবং শত্রু সেনাদের একাধিক ঘাঁটিতে আঘাত হানার দাবি করেছে তারা। এ ছাড়া ইক্লিম আল-তুফাহর আকাশে একটি ইসরায়েলি ড্রোন প্রতিহত করার কথাও জানিয়েছে হিজবুল্লাহ।

চলতি বছরের ২ মার্চ ইরান-ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলে রকেট হামলা চালালে লেবানন সরাসরি এই সংঘাতের মুখে পড়ে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিকে হত্যা এবং লেবাননে ক্রমাগত ইসরায়েলি হামলার জবাবে হিজবুল্লাহ ওই পদক্ষেপ নিয়েছিল।

পরবর্তীকালে গত ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও ইসরায়েল লেবাননে তাদের অভিযান বন্ধ করেনি। ইসরায়েলের দাবি, গাজা বা ইরান ফ্রন্ট এবং লেবানন ফ্রন্ট দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। তবে ইরান শুরু থেকেই বলে আসছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনো শান্তি চুক্তির পূর্বশর্ত হলো লেবাননেও যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে।

সোমবার ইসরায়েলে পাল্টা হামলা সমাপ্তির ঘোষণা দিয়ে ইরানের সামরিক বাহিনী সতর্ক করেছে যে, দক্ষিণ লেবাননসহ অন্য কোথাও পুনরায় আগ্রাসন চালানো হলে তার জবাব দেওয়া হবে ‘আরও কঠোর ও দমনমূলক ব্যবস্থার’ মাধ্যমে।

তবে ইরানের এই হুঁশিয়ারি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ। তিনি হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার এবং উত্তর ইসরায়েলে যেকোনো হামলার জবাবে বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলিতে পাল্টা হামলা চালানোর অঙ্গীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘লেবানন ও ইরানকে এক সুতোয় গেঁথে ইসরায়েলে আক্রমণ করার যেকোনো ইরানি প্রচেষ্টাকে তীব্র শক্তির মাধ্যমে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।’

লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম সোমবার এক বিবৃতিতে জানান, গত ১৬ এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েল প্রায় ৩ হাজার ৫০০টি বিমান হামলা, ৪০৭টি ভবন ধ্বংস এবং ৬টি সমতলকরণ (যা পুরো গ্রামকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়) অভিযান চালিয়েছে।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি আগ্রাসনে এ পর্যন্ত মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৬৩৭ জনে এবং আহত হয়েছেন ১১ হাজার ১৮৮ জন। দেশের মোট জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশ অর্থাৎ ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, বৈরুত, সিডনসহ সব অঞ্চলের সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রগুলো ইতিমধ্যে তাদের সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতায় পৌঁছে গেছে।

আন্তর্জাতিক উদ্ধার কমিটি (আইআরসি) সতর্ক করে বলেছে, লেবাননের মানবিক সংকট দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বাস্তুচ্যুত মানুষের ৯৪ শতাংশই তাদের মৌলিক চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন।

আইআরসি-এর লেবানন কান্ট্রি ডিরেক্টর রিক বার্টেলডাস আল জাজিরাকে বলেন, ‘দক্ষিণ লেবাননে যারা ফিরে আসছেন, তারা দেখছেন যে তাদের ঘরবাড়ি বা পুরো গ্রাম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। মানবিক চাহিদা এখন ব্যাপক। সংকট কাটিয়ে ওঠার একমাত্র আশা হলো একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি।’

সূত্র: আল-জাজিরা