চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) চালু হয়েছে দেশের প্রথম ‘চীন-বাংলাদেশ ওশান স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন ফর মেরিন রিমোট সেন্সিং (স্যাটেলাইট ওশান অবজারভেশন অ্যান্ড ডাটা ইনোভেশন সেন্টার)।
৯ জুন (মঙ্গলবার) সকাল ১০ টায় স্যাটেলাইট ওশান অবজারভেশন অ্যান্ড ডাটা ইনোভেশন সেন্টারে উদ্ধোধনের মাধ্যমে এর যাত্রা শুরু হয়। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ এই সেন্টার উদ্বোধন করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ভূমি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।
এ কেন্দ্র চালুর মাধ্যমে সামুদ্রিক গবেষণা, উপকূলীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং নীল অর্থনীতির বিকাশে বাংলাদেশের সক্ষমতা নতুন মাত্রা লাভ করবে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, এতে খরচ হয়েছে প্রায় ৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৫০ কোটি টাকার কারিগরি সহায়তা দিয়েছে চীনের সেকেন্ড ইনস্টিটিউট অব ওশানোগ্রাফি। বাকি ২০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বঙ্গোপসাগর নিয়ে উচ্চমানের গবেষণা করতে নিজস্ব রিয়েল-টাইম ডাটা ও নমুনা সংগ্রহ করতে, শিক্ষা ও গবেষণার কাজে সমুদ্র থেকে সরাসরি ডাটা বা নমুনা সংগ্রহের করতে এটি ব্যবহার করে হবে। এর ফলে ডাটা পেতে বিলম্ব হবে না, রেজোলিউশন বেশি হবে,অনেক তথ্য উন্মুক্ত থাকবে এবং কাংখিত পরিমাণ ও লেবেলের ডাটা পাওয়া যাবে। এটি একটি এক্স (ফ্রিকোয়েন্সি পরিসর: প্রায় 8-12 GHz) অ্যান্ড এল (ফ্রিকোয়েন্সি পরিসর:প্রায় 1-2 GHz) ব্যান্ড স্যাটেলাইট ডাটা রিসেপশন সিস্টেম, যা বঙ্গোপসাগরের উপর দিয়ে উড়ন্ত বিভিন্ন ওশান ও আবহাওয়া (আর্থ অজারভেশন) স্যাটেলাইট থেকে ডাটা সংগ্রহ করতে সক্ষম। প্রাপ্ত স্যাটেলাইটগুলোর মধ্যে রয়েছে ৭টি চীনা স্যাটেলাইট। এরমধ্যে রয়েছে ডায়নামিক স্যাটেলাইট: এইচওয়াই২বি, এইচওয়াই২সি, ওশান পর্যবেক্ষণ স্যাটেলাইট: এইচওয়াই১সি, এইচওয়াই১ডি; আবহাওয়া বিষয়ক স্যাটেলাইট: এফওয়াই৩এ, এফওয়াই৩বি, এফওয়াই৪। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (USA) SNPP, NOAA২০ও ২১, MODIS/AQUA এবং ইউরোপের (EUMETSAT/ESA) Metop-বি (Metop-B) এবং জাপানের হিমাওয়ারি (Himawari ৯)।
কেন ওশান স্যাটেলাইট স্টেশন গুরুত্বপূর্ণ:
স্যাটেলাইট ও রেমোটসেন্সিং ভিত্তিক সমুদ্র শিক্ষা ও গবেষণার সক্ষমতা তৈরি করবে যা গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জিরো লেভেল থেকে উচ্চ লেভেলে ডাটা হেন্ডলিং, সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যার কাস্টমাইজ করা, আত্মারিদম ডেভেলপ করা, ইকুইশন মডিফাই কিংবা উন্নত করা এবং সাথে সাথে এআই, মেশিন লার্নিং, নিউরাল নেটওয়ার্কিং ব্যবহার করে বিগ ডাটা আনাল্যসিস কেপাসিটি তৈরির মাধ্যমে স্কিল ম্যানপাওয়ার তৈরিতে সাহায্য করবে। এই স্টেশনের মাধ্যমে ক্লোরোফিল-এ ঘনত্ব (শৈবালের পরিমাণ) ও সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার রিয়েল-টাইম মানচিত্র তৈরি করার গবেষণা পরিচালনা করতে পারবে। এতে মাছের সম্ভাব্য অবস্থান নির্ধারণ সহজ হবে, যা মৎস্যজীবীদের আয় বাড়াবে এবং টেকসই মাছ ধরায় সহায়তা করবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, স্রোতের গতিপথ, এবং বায়ুর চাপের স্যাটেলাইট ডাটা, ঘূর্ণিঝরের তীব্রতা ও আঘাত হানার স্থান আরও নির্ভুলভাবে পূর্বাভাস সম্পর্কে জানতে পারবে। সামুদ্রিক খনিজ জরিপ, অফশোর গ্যাসক্ষেত্র নিরীক্ষণ, বন্দর ব্যবস্থাপনা, এবং সামুদ্রিক পর্যটনসহ সব ডাটা সরবরাহ করবে এ প্রকল্প।
এছাড়াও, এ প্রকল্পে থাকবে নিরাপত্তা। এটি সম্পূর্ণ সিভিল ও গবেষণাভিত্তিক একটি প্রকল্প। সব ডাটাই চীনে ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছেও সংরক্ষিত আছে। তাছাড়া পারস্পরিক সকল কার্যক্রম বাংলাদেশ সরকারের প্রচলিত আইন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের আওতায় পরিচালিত হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ভূমি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, "আমাদের নাবিক,পন্যবাহী জাহাজ, টলারের জন্য এ প্রজেক্ট এর মাধ্যমে পাওয়া তথ্যগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখন তারা বর্তমানে পরিবেশের সম্ভাব্য আবহাওয়া, মাছের অবস্থান সম্পর্কে জানতে পারবে। আমাদের দেশে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমরা সরকার যখন যাত্রা শুরু করেছিলাম তখন আমাদের ৩০ লক্ষ কোটি টাকা লোনের বোঝাও ছিল। এ প্রকল্পে সীমাবদ্ধ থাকলেও যে উদ্দেশ্যের জন্য এটি স্থাপন করা আছে আমরা সে উদ্দেশ্য পূরণের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাব। প্রয়োজনে আমরা নিরবিচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ সরবরাহ করব।"
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান বলেন, "আজ এক ঐতিহাসিক দিন। বাংলাদেশের প্রথমবার মতো এমন একটি প্রকল্প চালু হয়েছে। শুধু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নয় বাংলাদেশের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয় যেসব শিক্ষার্থীরা গবেষণার করতে চায় এটি তাদের অনেক সাহায্য করবে। যারা ফিশিং এর সাথে জড়িত তারা কোথায় ঘনত্ব বেশি কোথায় গেলে মাছ বেশি পাওয়া যাবে এ বিষয়ে একটি ধারণা নিতে পারবে। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের যদি দক্ষ করতে হয় এটি অন্যতম একটি প্রকল্প।
এর আগে, ২০১৯ সালে চীনের জাতীয় সমুদ্র গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেকেন্ড ইনস্টিটিউট অব ওশানোগ্রাফি (SIO)-এর সঙ্গে যৌথ শিক্ষা ও গবেষণার উদ্যোগ নেয় চবি ওশানোগ্রাফি বিভাগ। আলোচনা শেষে ২০২০ সালে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। করোনা মহামারির কারণে কার্যক্রমে বিলম্ব হলেও ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে চবির তৎকালীন প্রশাসন SIO পরিদর্শন করে স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন ফর মেরিন রিমোট সেন্সিং নির্মাণ ও অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর আওতায় SIO প্রযুক্তিগত ও যন্ত্রপাতিগত সহায়তা এবং চবি ইন-কাইন্ড সহায়তা প্রদান করছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মামুন আহমেদ, ( ইউজিসি) সদস্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আইয়ুব ইসলাম, উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর ড. মো: কামাল উদ্দিন, বাংলাদেশে নিযুক্ত চীন দূতাবাসের কালচারাল কাউন্সিলর মি. লি শেওপেং, সেকেন্ড ইনস্টিটিউট অফ ওশানোগ্রাফি ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল প্রফেসর ড. ফু বিন।