গ্রেপ্তারের পরই জামিন আবার একই অপকর্মে

কিশোর গ্যাং ‘পাটালি গ্রুপের’ সদস্য মুন্নাসহ কয়েকজন গত ৯ আগস্ট সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযানে গ্রেপ্তার হয়। পরে তাদের মোহাম্মদপুর থানায় হস্তান্তর করা হয়। পুলিশ পুরনো একটি মামলায় মুন্নাকে আদালতে প্রেরণ করে। তবে দুদিনের মধ্যে সে জামিনে বের হয়ে আসে। এর চার দিনের মাথায় বনানী সিসা বারে রাহাত হোসেন রাব্বি (৩০) নামে এক যুবককে খুনের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। পরে মুন্নাকে আবার গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।  

মুন্নার বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় ছিনতাই ও মারামারিসহ একাধিক মামলা রয়েছে। সেসব মামলায় আগেও তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। জামিনে বের হয়ে ফের ছিনতাই, মারামারিতে লিপ্ত হয়েছে কিশোর গ্যাংয়ের এ সদস্য। 

ছিনতাই মামলায় গত ফেব্রুয়ারি মাসে গ্রেপ্তার হয় কিশোর গ্যাং সদস্য ইমন ও শিপন। মাস যেতে না যেতেই জামিনে বের হয় তারা। এবারও তারা মোহাম্মদপুর নবীনগরে কুরিয়ার সার্ভিসের ডেলিভারিম্যানকে কুপিয়ে টাকা ও মোবাইল ছিনিয়ে নেয়। এ ঘটনায় ১৮ মার্চ ফের গ্রেপ্তার হয় ইমন ও শিপন। চুরির মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে এক মাস কারাগারে ছিল শাহাদাত। সেখান থেকে জামিনে বের হয় মাত্র চার দিনে। এরপর আবার চুরি করে এবং পুলিশের হাতে আবারও গ্রেপ্তার হয়। সম্প্রতি জামিনে বেরিয়ে সাঈদ গ্যাংয়ের সদস্যরা আদাবর এলাকায় বাড়ির মালিক ও এমব্রয়ডারি কারখানায় তান্ডব চালায়। 

ইমন-শিপনসহ এদের মতো ঢাকায় কিশোর গ্যাংয়ের অনেক সদস্য গ্রেপ্তারের এক থেকে তিন মাসের মধ্যে জামিনে বেরিয়ে আসে। কেউ আবার বের হয় সপ্তাহের ব্যবধানেই। লিপ্ত হয় একই অপরাধ কর্মে।

তারা জামিন পাচ্ছে কীভাবে : আইনজীবীরা বলছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আসামিদের সন্দেহভাজন হিসেবে অজ্ঞাতনামা আসামি থাকা মামলায় আদালতে পাঠায় পুলিশ। আসামিরা যে ঘটনার সঙ্গে জড়িত, সে বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা বা ব্যাখ্যা অনেক মামলায় দেওয়া হয় না, যা তাদের জামিন পাওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করে। সঠিক ধারায় মামলা না দিয়ে পুরনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়, অপরাধ অনুযায়ী মামলা না নিয়ে দুর্বল ধারায় মামলা করা হয়। ফলে অপরাধের মাত্রা যা-ই হোক, বিচার না হওয়া পর্যন্ত জামিন নাগরিক অধিকার হিসেবেই বিবেচিত হয়। বেশিরভাগ মামলার তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দিতে গড়ে ন্যূনতম এক বছর লেগে যায়। এরপর বিচার শুরু হলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের ভূমিকা রাখার সুযোগ থাকে। এর আগের কাজটা মূলত পুলিশের। পুলিশ বলছে, প্রকৃত অপরাধীদের জামিন দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে আসামির জামিনের বিরোধিতায় আদালতে শক্তভাবে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয় না। ফলে সহজে জামিন পেয়ে যায় গ্যাং সদস্যরা। 

ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতের প্রধান কৌঁসুলি আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী দেশ রূপান্তরকে বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের এক সদস্য কোন ঘটনার সঙ্গে জড়িত, কী ধরনের অপরাধ করেছে, কার সঙ্গে অপরাধ করেছে, তার কাছ থেকে কী ধরনের অস্ত্রশস্ত্র পাওয়া গেছে মামলায় এমন সুনির্দিষ্ট তথ্য উল্লেখ না করলে ওই ব্যক্তি সহজে জামিন পেয়ে যায়। পুলিশ মামলায় এসব উল্লেখ করে না। পুরনো মামলা, ছিনতাইয়ের চেষ্টা এমন সাধারণ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে প্রেরণ করে। প্রকৃত আসামির জামিনের ক্ষেত্রে আইনজীবীদের বিরোধিতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা যথেষ্ট যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করি। তা সত্ত্বেও আদালত অনেক সময় নিজে থেকে জামিন দিয়ে দেয়। তখন আমাদের কি করার থাকে। কিশোর গ্যাং যেহেতু সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে, তাই এদের জামিন না দেওয়ার ব্যাপারে আদালতের নিজ থেকে উদ্যোগ নেওয়া উচিত। মামলার ভেতরে বড় ধরনের গ্রাউন্ড না থাকলে প্রসিকিউশন বা আদালতের কিছু করার থাকে না। তার পরামর্শ, গ্যাং সদস্যরা প্রতিটি এলাকায় কারও না কারও প্রশ্রয়ে চলছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, এমপিরা যদি সেদিকে নজর দেন, মনিটরিং করেন তাহলে এদের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এসএন মো. নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের মতো অপরাধীর যেন দ্রুততর সময়ে জামিন না হয়, সে জন্য সব পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে কোনো পক্ষ লাভবানের আশা না করে সার্বিকভাবে রাষ্ট্র ও আপামর জনসাধারণ যাতে উপকৃত হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত। একজন আসামির জামিন করালে, মামলা আদালতে প্রেরণ করলে, কম ধারায় চালান দিলে হয়তো একজন লাভবান হন। আর এতে রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ধরনের অপরাধী গ্রেপ্তারের পর দুর্বল ধারায় মামলা না দিতে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হবে কি না এ রকম প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, অনেক দিন ধরে এমন (দুর্বল ধারায় মামলা দেওয়া, এজাহারে সুনির্দিষ্ট তথ্য উল্লেখ না করাসহ) অভিযোগ রয়েছে। ডিসি ও তদন্ত কর্মকর্তাদের আগ থেকে নির্দেশনা দেওয়া আছে। মামলা যাতে যাচাই-বাছাই করে আদালতে প্রেরণ করা হয়, সে বিষয়ে আবারও নির্দেশনা প্রদান করা হবে।    

প্রতিদিনই গ্রেপ্তার, তবু নেই পরিসংখ্যান : ডিএমপির ৫০টি থানার মধ্যে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো থানা পুলিশের অভিযানে কিশোর গ্যাং সদস্য গ্রেপ্তারের তথ্য গণমাধ্যমে পাঠানো হয়। অথচ এই গ্যাং সদস্যদের আলাদা ডাটা নেই ডিএমপির কাছে। এদের গ্রেপ্তারের পরিসংখ্যান চাওয়া হয় ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) এনএস নাসিরুদ্দিনের কাছে। তিনি ডিএমপি সদর দপ্তরে এ পরিসংখ্যান চেয়েও পাননি। পরে জানান, আলাদা করে কিশোর গ্যাং সদস্য গ্রেপ্তারের তালিকা করে না পুলিশ। কে কোন অপরাধ করেছে, সেই অপরাধের ভিত্তিতে মামলা করা হয়। ডিএমপি ও পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তার কাছে এ সংক্রান্ত পরিসংখ্যান চেয়ে এক মাসেও পাওয়া যায়নি। ডিএমপির কয়েকটি বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার জানান, কিশোর গ্যাংয়ের আলাদা কোনো পরিসংখ্যান করে না তারা। ঢালাও গ্রেপ্তার করে ঢালাও চালান দেওয়ার কথা বলছে পুলিশ নিজেই। ঢালাও চালান দেওয়ার ফলে কিশোর গ্যাংয়ের মতো গুরুতর অপরাধীর বিরুদ্ধে করা মামলা দুর্বল ধারায় দেওয়া হয়। 

কিশোর গ্যাংসহ অন্যান্য অপরাধীর জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়ানোর মতো পরিস্থিতি ঠেকাতে পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন আইজিপি আলী হোসেন ফকির। আইজিপি হওয়ার পর গত ফেব্রুয়ারি মাসে মোহাম্মদপুর এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে তিনি বলেন, এলাকাভিত্তিক এসব অপরাধীর তালিকা থাকবে। জামিনে আসার পর প্রতি সপ্তাহে সংশ্লিষ্ট থানার ওসির কাছে হাজিরা দেবে। এ প্রক্রিয়া শিগগির শুরু হবে। কিন্তু তিন মাসেও এ প্রক্রিয়া কিংবা পরিকল্পনার কোনো অগ্রগতি হয়নি।

নামে কিশোর গ্যাং হলেও বেশিরভাগ সদস্যের বয়স ১৮ বছরের বেশি। আবার যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে, আইনের আওতায় আসা সেসব শিশু-কিশোরকে অপরাধমূলক কর্মকা- থেকে দূরে রাখতে এবং তাদের সংশোধন করে সুস্থ ধারায় ফেরাতে দেশে সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতাধীন তিনটি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র রয়েছে। এসব উন্নয়ন কেন্দ্রে থাকা শিশুদের কতটা কাউন্সেলিং ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় তা নিয়ে বরাবরই প্রশ্ন উঠেছে। সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইন করে বা সাজা দিয়ে অপরাধ থেকে নিবৃত্ত করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংস্কার যদি না হয়, সন্তানের প্রতি যদি নজর না দেওয়া হয়, তাহলে আইন করে বিচার করে কিশোর গ্যাংয়ের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হবে না।

মাঝে মধ্যে কাউন্সেলিং : তিনটি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে গত ৬ জুন পর্যন্ত এক হাজার ৪৬ শিশু বন্দি (কিশোর গ্যাংসহ বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্ত) থাকার তথ্য জানা যায়। তারা সবাই জামিন বা বিচার শেষ হওয়ার অপেক্ষায় আছে। এর মধ্যে টঙ্গীর সংশোধনাগারে (বালক) রয়েছে ৬৯৩ শিশু। যার মধ্যে ছয়জন বিভিন্ন মামলায় সাজা হয়ে আটকাদেশপ্রাপ্ত। কোনাবাড়ী উন্নয়ন কেন্দ্রে (বালিকা) রয়েছে ১১০ শিশু। যশোর পুলেরহাট উন্নয়ন কেন্দ্রে রয়েছে ২৪৩ শিশু। এর মধ্যে দুজন আছে সাজাপ্রাপ্ত। এসব উন্নয়ন কেন্দ্রে শিশু-কিশোরদের কতটা কাউন্সেলিং কিংবা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তা নিয়ে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তবে উন্নয়ন কেন্দ্র সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তাদের কাউন্সেলিংয়ের ফলে অনেক শিশুই ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে বের হয় এবং মূল ধারার জীবনযাপন করে।

যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক মো. মঞ্জুরুল হাসান দেশ রূপান্তরকে জানান, তার কেন্দ্রে দুজন সাইকো-সোশ্যাল (মনো-সামাজিক) ও দুজন কাউন্সিলার রয়েছেন। শিশুদের সমস্যা দেখা দিলে এবং নতুন কোনো শিশু এলে মানসিক ও স্বাস্থ্য বিষয়ে তারা কাউন্সেলিং করে থাকেন। 

টঙ্গীর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের মনো-সামাজিক কাউন্সিলর লুবাবা সুলতানা দেশ রূপান্তরকে জানায়, এ কেন্দ্রে মোট আট কাউন্সিলর রয়েছেন। তারা নতুন আসা, দীর্ঘদিন ধরে থাকার ফলে মানসিক ট্রমাগ্রস্ত হওয়া এবং বাইরে থেকে ব্যাপক মাদকাসক্ত হয়ে আসা শিশুদের কাউন্সেলিং করে থাকেন। জীবন দক্ষতার ওপর গ্রুপ সেশন নেওয়া এবং টেইলারিং দর্জি ও ইলেকট্রিক কাজে শেখানো হয়। রাগ করা খারাপ নয়, তবে রাগের বশবর্তী হয়ে কাউকে মেরে ফেলা খারাপ। এভাবে বোঝানোর পর শিশুরা ভুল বুঝতে পারে। তাদের প্রশিক্ষণের ফলে অনেক শিশু ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে বের হয়। তবে অনেকে বাইরের পরিবেশে গিয়ে আবারও কোনো অপরাধে জড়াচ্ছে কি না, সেটি দেখভালের সুযোগ তাদের নেই। এ ক্ষেত্রে পরিবার, সরকার ও সমাজের আরও নজর দেওয়া প্রয়োজন। 

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, কিশোর গ্যাং সদস্য যাতে অল্প সময়ের ব্যবধানে জামিন না পায়, সে জন্য পুলিশ ও আইনজীবী উভয়কে ভূমিকা রাখতে হবে। শুধু আইন করে বা সাজা দিয়ে কাউকে অপরাধ থেকে নিবৃত্ত করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংস্কার যদি না হয়, সন্তানের প্রতি যদি নজর না দেওয়া হয়, তাহলে আইন করে বিচার করে কিশোর গ্যাংয়ের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হবে না।