চট্টগ্রাম বন্দরের চলমান চারটি টার্মিনালের (জিসিবি, এনসিটি, সিসিটি ও পিসিটি) মধ্যে সবচেয়ে বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে এনসিটি। এনসিটির (নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল) ওপর ভর করেই চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আহরিত হয়। তাই অনেকে এনসিটিকে ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’ও বলে থাকে। এই হাঁস পাওয়ার জন্য শেখ হাসিনার সরকারের সময় থেকে অন্তর্বর্তী সরকার পর্যন্ত আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ড। এ আলোচনার মাঝে দেশীয় কোম্পানি এমজিএইচ প্রস্তাবনার পর আরও তিন কোম্পানি একটি কনসোর্টিয়াম করে একটি প্রস্তাবনা দিয়েছে সরকারের কাছে।
কিন্তু জিটুজি চুক্তির আওতায় যেখানে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে এনসিটি বরাদ্দের বিষয়টি চলমান রয়েছে, সেখানে দেশীয় কোম্পানির প্রস্তাব বিবেচনার সুযোগ আছে কি? জানতে চাইলে নৌ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ জাকারিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। তাদের সঙ্গে আলোচনা শেষ না করে নতুন প্রস্তাবনা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ নেই।’
একই মন্তব্য করে পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে। এখন প্যারালাল আরেকটি অফার নিয়ে আলোচনার সুযোগ নেই। প্রথম পক্ষের সঙ্গে আলোচনা শেষ হলেই দ্বিতীয় প্রস্তাবনা নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি হবে।
পিপিপির আওতায় বিদেশি প্রতিষ্ঠান শুধু গ্রিনফিল্ডে বিনিয়োগ করতে পারবে। রেডিমেড স্থাপনায় করতে পারবে না বলে অনেকে মন্তব্য করছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে চৌধুরী আশিক মাহমুদ বলেন, এমন কোনো বিধি পিপিপিতে নেই। দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান যেকোনো স্থানেই বিনিয়োগ করতে পারবে। এদিকে এনসিটি পেতে দেশীয় কোম্পানি এমজিএইচের পাশাপাশি সাইফ পাওয়ার টেক, কসমস এন্টারপ্রাইজ ও এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস লিমিটেড নামে তিনটি প্রতিষ্ঠান কনসোর্টিয়াম করে বরাদ্দের প্রস্তাবনা দিয়েছে। গত ২৯ এপ্রিল এ কনসোর্টিয়াম নৌ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা জমা দিলেও তা এতদিন গোপন থাকার পর গত সোমবার এ প্রস্তাবনাটি সামনে আসে। কনসোর্টিয়াম প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস লিমিটেডের কর্ণধার সরকারদলীয় সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম। কনসোর্টিয়ামের অন্য প্রতিষ্ঠান কসমস এন্টারপ্রাইজের মালিকও সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ও সংসদের হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান। আর কনসোর্টিয়ামের প্রধান অংশীদার ২০০৬ সাল থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার পরিবহন কাজে নিয়োজিত সাইফ পাওয়ার টেক। এসব নিয়ে কথা হয় শাহাদাত হোসেন সেলিমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর তথা দেশের স্বার্থে আমরা দেশীয় কোম্পানি এনসিটি পরিচালনা করতে চাই। বিদেশি প্রতিষ্ঠান যে অর্থ বন্দরকে দেবে, আমরা এর চেয়ে বেশি দেব। তারপরও কেন আমাদের দেওয়া হবে না?’
একটি দেশের সঙ্গে যেখানে চুক্তির শর্ত নিয়ে আলোচনা চলছে, সেখানে আরেক পক্ষের সঙ্গে কি আলোচনা করা যায়? এ প্রশ্নের জবাবে শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, ‘কেন যাবে না? দেশের স্বার্থে অবশ্যই সম্ভব। এর জন্য সরকার প্রয়োজনে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করতে পারে। যে প্রতিষ্ঠান বেশি দর দেবে, সরকার তাকে বরাদ্দ দেবে।’
সেলিমের বক্তব্যের সঙ্গে সুর মিলিয়ে সাইফ পাওয়ার টেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার রুহুল আমিন বলেন, ‘এনসিটির কর্তৃত্ব চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকবে। আমরা শুধু পরিচালনা করব। সব ধরনের ট্যারিফও বন্দর আদায় করবে। সেখান থেকে কনটেইনারপ্রতি যে রেট চূড়ান্ত হবে, সেই টাকা বন্দর আমাদের পরিশোধ করবে। এতে দেশের টাকা দেশেই থাকবে এবং দেশীয় কোম্পানিগুলোরও প্রসার ঘটবে।’
চলমান একটি চুক্তির আলোচনার মাঝে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব বিবেচনার সুযোগ নেই বলছে মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে তরফদার রুহুল আমিন বলেন, সরকার এটি একপক্ষীয় চুক্তি করতে যাচ্ছে। তাই দেশের স্বার্থে সেই আলোচনা বাতিল করে প্রয়োজনে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া হোক।
দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদের নেতা ইব্রাহিম খোকন বলেন, এনসিটিতে কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় আসুক, আমরা তা চাই না। বর্তমানে দেশীয় প্রতিষ্ঠান যেভাবে পরিচালনা করছে, সেভাবেই করুক। সরকার চাইলে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে যে প্রতিষ্ঠান বেশি রাজস্ব দেবে তাকে দায়িত্ব দিতে পারে। তিনি বলেন, বর্তমানে এনসিটিতে যে পরিমাণ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হচ্ছে, এর চেয়ে বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং আর সম্ভব নয়। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং হচ্ছে এখানে। তাই বিদেশি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করতে চাইলে গ্রিনফিল্ড বে-টার্মিনালে করুক। সেখানে গিয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠান সক্ষমতা প্রমাণ করুক। এই রেডিমেড টার্মিনালে কেন আসবে?
এর আগে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি বরাদ্দ দিয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। কিন্তু গত ২৯ জানুয়ারি থেকে বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলনের কারণে ৯ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে এ চুক্তি স্থগিতের ঘোষণা দেয়। তৎকালীন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন চুক্তির কার্যক্রম স্থগিত রাখার ঘোষণার পর আন্দোলন কর্মসূচি থেকে সরে এসেছিলেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ৪ জুন নৌ মন্ত্রণালয়ের সভাশেষে আবারও সেই চুক্তির নেগোসিয়েশন শুরুর নির্দেশনা দিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৫ জুন নতুন নেগোসিয়েশন কমিটি গঠনের সুপারিশও করা হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে। আর এতেই এনসিটি ইস্যু আবারও চাঙা হয়ে ওঠে।
প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক এনসিটি কেন চাহিদার শীর্ষে? ২০০৭ সালে ৭০০ কোটি টাকা খরচ করে এনসিটি নির্মাণ করা হয়েছিল। চট্টগ্রাম বন্দরের ১৮টি কি গ্যান্ট্রিক্রেনের মধ্যে ১৪টি এই টার্মিনালে রয়েছে। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের জিসিবি (জেনারেল কার্গো বার্থ) ও সিসিটির (চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল) তুলনায় বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে এনসিটি। আর সবই দেশীয় অপারেটর দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে সৌদি আরবের রেডসি গেটওয়ে পরিচালনা করছে পিসিটি (পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল)। গত বছর চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনারের ৪৪ শতাংশ এনসিটিতে, ৩৬ শতাংশ জিসিবিতে (জেনারেল কার্গো বার্থ), ১৬ শতাংশ সিসিটিতে এবং প্রায় ৪ শতাংশ পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে হ্যান্ডলিং হয়েছে। এনসিটিতে একসঙ্গে চারটি জাহাজ ভিড়তে পারবে, আর তাই সবার টার্গেট এই এনসিটি।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ল্যান্ড লর্ড (সরকারের ভূমিতে প্রাইভেট বিনিয়োগে বন্দর নির্মাণ) পদ্ধতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। এ জন্যই বে-টার্মিনালে নির্মাণ হতে যাওয়া তিনটি টার্মিনালের মধ্যে দুটির একটিতে ডিপি ওয়ার্ল্ড, অপরটিতে পিএসএ সিঙ্গাপুরের সঙ্গে সরকারের চুক্তি হয়েছে। পতেঙ্গার লালদিয়ায় চুক্তি হয়েছে ডেনমার্কের এপিমুলারের সঙ্গে। রেডিমেড বন্দরে বিনিয়োগ কম। যেদিন বিনিয়োগ করবে, সেদিন থেকেই লাভ আসবে। কিন্তু গ্রিনফিল্ডে টার্মিনাল নির্মাণের সময় যেমন বেশি লাগবে, তেমনি বিনিয়োগে টাকাও বেশি লাগবে। রিটার্ন আসতে দেরি হবে। এ জন্যই বিনিয়োগকারীরা গ্রিনফিল্ডের তুলনায় রেডিমেডে বিনিয়োগে আগ্রহী বেশি।