ভঙ্গুর অর্থনীতিকে টেনে তোলা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং অনগ্রসর খাতের অগ্রগতির রূপরেখা সামনে রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট তৈরি করেছে সরকার। আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বাজেট প্রস্তাব উত্থাপন করবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। পরে মাসজুড়ে সরকার ও বিরোধী দলের সম্পূরক আলোচনা শেষে কণ্ঠভোটে বাজেট পাস হবে, যা আগামী বছর ৩০ জুন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
জানা গেছে, বাজেটে বৈষম্যহীন আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জনে দারিদ্র্য নিরসন ও সামাজিক সুরক্ষা; নারীর ক্ষমতায়ন; কৃষক, কৃষি উন্নয়ন ও নিরাপদ খাদ্য; দেশব্যাপী কর্মসংস্থান; যুব উন্নয়ন; শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন; স্বাস্থ্যসেবা; শ্রম ও শ্রমিক কল্যাণ; বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসীকল্যাণ; বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন; গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন; অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নের রূপরেখা দেবেন অর্থমন্ত্রী।
বাজেটে মোটা দাগে তিনটি চ্যালেঞ্জ দেখছেন বিশ্লেষকরা, যার মধ্যে ভেঙেপড়া অর্থনীতিকে সচল করা; বাজেটের আকারের পরিপ্রেক্ষিতে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ও ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকনির্ভরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ¦ালানি সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। এসবের বিবেচনায় একটি বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট প্রস্তাবের আশা করছেন তারা, যার মাধ্যমে বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক স্থবিরতা, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিনিয়োগে মন্দা, রপ্তানি হ্রাস এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের মতো সংকট মোকাবিলা সম্ভব হবে।
শঙ্কা ও সংকটের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সামনের দিনে জনস্বস্তি নিশ্চিত করা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাই মূল কাজ।’
জানা গেছে, বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের আলোকে সংস্কার কার্যক্রম ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। পাশাপাশি দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি; ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট; ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট; আগামী অর্থবছরের চ্যালেঞ্জগুলো এবং তা মোকাবিলায় করণীয় বিষয়ে প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। এ ছাড়া জাতীয় বাজেট চূড়ান্তকরণে পরবর্তী কার্যক্রম তুলে ধরেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, মোবাইল ফোন, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ফ্রিজ-এসিসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্যে কর-শুল্ক কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ফলে এসব খাতের পণ্য ও সেবার দাম কমতে পারে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া বাজেটে কর ও শুল্ক কাঠামো এমনভাবে সাজানোর চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, শিল্পের কাঁচামাল, চিকিৎসা সামগ্রী, প্রযুক্তিপণ্য ও পরিবেশবান্ধব খাতে খরচ কমে। কারণ সরকারের উদ্দেশ্য হলো মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো এবং বিনিয়োগে উৎসাহিত করা।
অন্যদিকে বিলাসী পণ্যের আমদানির শুল্কবৃদ্ধির প্রস্তাব করবেন অর্থমন্ত্রী, যাতে দেশীয় শিল্প সুরক্ষা পায়। পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলচালিত বিলাসবহুল গাড়ির করভারও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হচ্ছে। এ ছাড়া দেশীয় মদের উৎপাদন পর্যায়ে প্রতি লিটারে ৫০০ টাকা সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, সরকার দেশের প্রতিটি ব্যক্তি ও পরিবারের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি পণ্যের ওপর উৎসে কর হ্রাসের একটি বড় জনমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মৌলিক কৃষি ও ভোগ্যপণ্য যেমন ধান, চাল, গম, আলু, গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, বীজসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর উৎসে করের হার ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ, ১ শতাংশ থেকে কমে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করবে। বিগত বছরগুলেতে দ্রব্যমূল্রের লাগমহীন ঊর্ধ্বগতিতে জনজীবনে যে নাভিশ্বাস উঠেছিল, তার বিপরীতে গণতান্ত্রিক সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এ পদক্ষেপ জনজীবনে স্বস্তি আনবে।
বিএনপির ইশতেহারে বলা হয়েছে, দেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের এ যাত্রা কোনো গোষ্ঠীর বিশেষ সুবিধার ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং দেশের প্রতিটি নাগরিকের উৎপাদনশীল শক্তির ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা হবে। এ ভিশনের কেন্দ্রে রয়েছে অর্থনৈতির গণতন্ত্রায়ন (ইকোনমিক ডেমোক্রাটাইজেশন), যেখানে অর্থনীতি হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, অংশগ্রহণমূলক এবং সবার জন্য উন্মুক্ত। এক্ষেত্রে দলটি ‘ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার’ প্রতিপাদ্য ঠিক করেছে।
সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দলের ইশতেহারের প্রতিধ্বনি করে বলেছেন, দেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তনে সরকারের এই যাত্রা কোনো গোষ্ঠীর বিশেষ সুবিধার ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং দেশের প্রতিটি নাগরিকের উৎপাদনশীল শক্তির ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা হবে। আমাদের এ ভিশনের কেন্দ্রে রয়েছে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন। যেখানে অর্থনীতি হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, অংগ্রহণমূলক এবং সবার জন্য উন্মুক্ত। যেখানে অভ্যন্তরীণ ও রপ্তানি খাতকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে। বিশেষ করে জনস্বস্তি নিশ্চিত করা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা হবে।
নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারের মোট ব্যয় ঠিক করা হয়েছে, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। ব্যয়ের বিপরীতে সরকার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা হতে পারে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। মোট বাজেট ঘাটতি ২৪৩ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। ঘাটতি মেটাতে সরকার বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করবে এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সংগ্রহ করবেন ১ লাখ ২৭ কোটি টাকা। মোট ব্যয়ের মধ্যে ৬ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা সরকার পরিচালনসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় করা হবে। নতুন অর্থবছরে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ব্যয় হতে পারে ৩ লাখ কোটি টাকা।
সরকারের প্রতিশ্রুতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটি মস্তবড় বাজেট ঘোষণা করলেই হবে না, এর বাস্তবায়নকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। সাধারণত সরকার গতানুগতিক অগ্রাধিকারের খাত নির্ধারণ করে থাকে। নতুন সরকার কিছু পরিবর্তন আনার কথা বলছে। যদি তেমন কিছু হয় তবে ভালো। তবে বাজেটের যে আকার শোনা যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সক্ষমতার অভাব রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘বাজেটের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জনের চেয়ে সফলতার বিষয়টিকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জনপ্রত্যাশা হচ্ছে স্বস্তির বাজেট। এ মুহূর্তে জনগণ উচ্চাভিলাষী বাজেট আশা করে না। বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, সবার মধ্যে এখন বড় সংকট হলো আস্থার সংকট। বাজেটের বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে এ সংকট দূর করা জরুরি। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া সংকটের বিষয়গুলো দূর করা যাবে না।
বাজেট প্রণয়ন সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘দেশের প্রতিটি মানুষের কথা চিন্তা করেই আগামীর বাজেট দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে মাধ্যমে অর্থনীতিতে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চাই। একই সঙ্গে বাজেটের সুফল যাতে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়, সে বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) পক্ষ থেকে বলা হযেছে, অর্থনীতির গতি ফিরিয়ে আনতে হলে, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে। কর্মসংস্থান ছাড়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব নয়। নতুন বাজেটে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টিতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া দরকার। দেশের বর্তমান অর্থনীতি অতীতের অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের খেসারত দিচ্ছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।