বাজেটের ৫৫ বছর

ইতিহাস গড়ে বড় বাজেটের পথে বাংলাদেশ

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক যাত্রা ছিল অত্যন্ত বন্ধুর ও চ্যালেঞ্জিং। মাত্র ৪ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকার এক যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি নিয়ে যে স্বপ্নের যাত্রা শুরু হয়েছিল, ৫৫ বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশ আজ এক অভাবনীয় সাফল্যের শিখরে দাঁড়িয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হতে যাচ্ছে দেশের ৫৫তম জাতীয় বাজেট। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত এই বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক।

বর্তমান সরকারের মেয়াদে অর্থমন্ত্রী হিসেবে এটি আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট উপস্থাপন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে এই ঐতিহাসিক বাজেট প্রস্তাব পেশ করা হবে। নিয়ম অনুযায়ী, সংসদে উত্থাপনের আগে বাজেটটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদন লাভ করেছে এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন এতে সম্মতি জানিয়েছেন। আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন এই অর্থবছর আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে। এবারের বাজেটের মূল দর্শন হলো একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক অর্থনৈতিক সংস্কার। ‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ: ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির অভিযাত্রায় বাংলাদেশ’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখেই অর্থমন্ত্রী দেশের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরবেন।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেট প্রদানের গৌরব অর্জন করেছিলেন দেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী প্রয়াত তাজউদ্দীন আহমদ। ১৯৭২ সালে তিনি মাত্র ৭১৯ কোটি টাকার যে বাজেট পেশ করেছিলেন, তা ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের মূল ভিত্তি। ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত মোট ১৪ জন অর্থমন্ত্রী বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বাজেট পেশ করেছেন। ১১ জুন বাজেট উপস্থাপনের মাধ্যমে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী হচ্ছেন বাংলাদেশের বাজেট পেশকারী ১৫তম ব্যক্তি। ৫৫ বছরের ব্যবধানে দেশের বাজেটের আকার ১,৩০৩ গুণ বৃদ্ধি পাওয়া বাংলাদেশের অর্থনীতির এক বিশাল পরিবর্তনের সাক্ষ্য বহন করে।

বাংলাদেশের বাজেট ইতিহাসে সবচেয়ে বেশিবার বাজেট পেশের রেকর্ডটি যৌথভাবে ধরে রেখেছেন প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এবং এম সাইফুর রহমান। উভয়েই নিজ নিজ মেয়াদে মোট ১২টি করে বাজেট পেশ করেছেন। এ ছাড়া, শাহ এ এম এস কিবরিয়া এবং আ হ ম মুস্তফা কামালের মতো অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা দীর্ঘ সময় ধরে বাজেট উপস্থাপনের দায়িত্ব পালন করেছেন। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো বাজেটের আকার আগের বছরের চেয়ে কমানো হলেও, নতুন অর্থবছরে বড় বাজেটের লক্ষ্য নিয়ে সরকার ফের ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এতে আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান বা নিট ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। বড় অঙ্কের এই ঘাটতি মেটাতে সরকার বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করার পরিকল্পনা করেছে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার সংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশের অদম্য অগ্রযাত্রার একটি বলিষ্ঠ অঙ্গীকার।