শিশুশ্রম রোধে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

 

 

 

 

 

 

 

পৃথিবীর প্রতিটি শিশু সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। শিশুরাই দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ কর্ণধার। তবে দারিদ্র্য ও নানাবিধ সামাজিক সংকটের কারণে বর্তমান বিশ্বে শিশুশ্রম একটি অভিশাপ হিসেবে দেখা দিয়েছে। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হিসেবে শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও আত্মিক বিকাশের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছে। মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ এবং পবিত্র কোরআনের আলোকে বিচার করলে দেখা যায়, ইসলামে শোষণমূলক শিশুশ্রমের কোনো স্থান নেই।

ইসলামে শৈশবকে অত্যন্ত পবিত্র ও যতœযোগ্য সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শিশুর সুস্থ বিকাশের জন্য পিতামাতা ও রাষ্ট্রের ওপর সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের দারিদ্র্যের ভয়ে হত্যা কেরোা না। আমিই তাদের রিজিক দিই এবং তোমাদেরও।’ (সুরা বনি ইসরাইল ৩১)

এই আয়াতটি কেবল আক্ষরিক হত্যার কথা বলে না, বরং অভাবের দোহাই দিয়ে শিশুর ভবিষ্যৎ এবং তার শৈশবকে নষ্ট করা যে গর্হিত কাজ, সেই ইঙ্গিতও বহন করে। শিশুর সুন্দর জীবন নিশ্চিত করা অভিভাবকের ধর্মীয় দায়িত্ব।

শিশুর প্রধান কাজ হলো শিক্ষা গ্রহণ করা। ইসলামে জ্ঞানার্জনকে প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজ করা হয়েছে। যখন একটি শিশুকে শিক্ষার আসর থেকে সরিয়ে কলকারখানায় বা ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত করা হয়, তখন তার ওপর অর্পিত ধর্মীয় ফরজ (শিক্ষা গ্রহণ) পালনে বাধা সৃষ্টি করা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জ্ঞান অর্জন করা ফরজ।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ ২২৪)

যে বয়সে শিশুর হাতে কলম থাকার কথা, সেই বয়সে হাতুড়ি তুলে দেওয়া ইসলামের এই শাশ্বত নির্দেশের পরিপন্থী। শিক্ষিত প্রজন্ম গড়ে তোলার বদলে শিশুদের শ্রমিক বানানো জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার শামিল।

ইসলামের একটি মূলনীতি হলো, কারও ওপর তার সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে না দেওয়া। এটি সাধারণ শ্রমিকের বেলাতেও প্রযোজ্য। আর শিশুদের ক্ষেত্রে তো এটি আরও কঠোর। মহানবী (সা.) শ্রমিকের অধিকার সম্পর্কে বলতে গিয়ে নির্দেশ দিয়েছেন, তাদের ওপর এমন কোনো কাজ চাপিয়ে দিয়ো না, যা তাদের সাধ্যের বাইরে। শিশুদের হাড়ভাঙা খাটুনি বা কলকারখানার ভারী কাজ করানোর অর্থ হলো তাদের ওপর জুলুম করা। ইসলাম সব ধরনের জুলুমকে হারাম ঘোষণা করেছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) শিশুদের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু। তিনি শিশুদের সঙ্গে অত্যন্ত কোমল আচরণ করতেন। এক বেদুঈন একবার মহানবী (সা.)-কে শিশুদের চুম্বন করতে দেখে অবাক হয়ে বলেছিল, আমাদের তো অনেক সন্তান আছে, কিন্তু আমরা তাদের চুমু দিই না। নবীজি (সা.) উত্তরে বলেছিলেন, ‘আল্লাহ যদি তোমাদের অন্তর থেকে দয়া কেড়ে নেন, তবে আমার কী করার আছে?’ (সহিহ বুখারি) শিশুদের প্রতি এই মমত্ববোধ শিক্ষা দেয় যে, তাদের শৈশবকে কঠোর শ্রমের শেকলে বন্দি করা ইসলামি আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত।

ইসলামে জাকাত ও সদকার বিধান রাখা হয়েছে মূলত সমাজের দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য। শিশুশ্রমের প্রধান কারণ হলো দারিদ্র্য। যদি সম্পদশালীরা সঠিকভাবে জাকাত ও দান-সদকা প্রদান করত, তবে কোনো মা-বাবাকে তার শিশুসন্তানকে শ্রমের বাজারে পাঠাতে হতো না। ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় শিশুদের মৌলিক চাহিদা পূরণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। খলিফা ওমর (রা.)-এর শাসনামলে শিশুদের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা ছিল, যাতে অভাবের কারণে তাদের অধিকার ক্ষুণœ না হয়।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ইসলামি গবেষক