ন্যাটোর সামরিক শক্তি কমাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

ইউরোপে ন্যাটো পরিচালিত সামরিক অভিযানের জন্য নির্ধারিত বিমান ও নৌসম্পদের সংখ্যা কমানোর পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে ট্রান্সআটলান্টিক নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস-এর একটি প্রতিবেদনের সত্যতা নিশ্চিত করে ইউরোপীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ন্যাটো-নির্ধারিত যুদ্ধবিমান ও সামুদ্রিক নজরদারি বিমান মোতায়েন উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। পাশাপাশি একটি সাবমেরিন, একটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার এবং কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ অন্য অঞ্চলে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।

এই পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে ইউরোপ থেকে সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও আমেরিকায় সম্পদ বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ন্যাটো’র পূর্ব সীমান্তে ইতোমধ্যে বড় ধরনের সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম স্থানান্তরের ঘোষণা এসেছে, যা ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা সম্পর্কের মধ্যে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে। বিশেষ করে ইউরোপ যখন সম্ভাব্য রুশ সামরিক হুমকি নিয়ে বেশি সতর্ক, তখন এই সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে ন্যাটো জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের এই পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত এবং এটিকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করছে। ন্যাটো মুখপাত্র অ্যালিসন হার্ট বলেন, এই পরিবর্তন জোটকে দীর্ঘমেয়াদে আরও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে এবং একক কোনো সদস্য দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাবে।

তিনি আরও বলেন, ‘এই পরিবর্তন ন্যাটোর প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকে আরও শক্তিশালী করবে। এটি জোটের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই কাঠামো গড়ার অংশ।’

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোতে বরাদ্দকৃত এফ-১৬ ও এফ-১৫ই যুদ্ধবিমানের সংখ্যা প্রায় ১৫০ থেকে কমিয়ে ১০০-তে নামাতে চায়। একই সঙ্গে ২৬টি সামুদ্রিক নজরদারি বিমান থেকে কমিয়ে ১৫টি রাখা হতে পারে। আটটি আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানও পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হতে পারে।

এছাড়া ইউরোপীয় প্রতিরক্ষার জন্য বরাদ্দ থাকা দুটি বোমার টাস্ক ফোর্সের একটি অন্য অঞ্চলে স্থানান্তর করা হবে। একইভাবে একটি ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সাবমেরিন ও একটি বিমানবাহী রণতরীও অন্যত্র মোতায়েন করা হবে।

এই পরিবর্তনের ফলে ন্যাটোর গোয়েন্দা নজরদারি ও দূরপাল্লার আঘাত সক্ষমতায় প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে সম্ভাব্য রুশ আক্রমণ মোকাবিলায় ইউরোপীয় দেশগুলোকে বিকল্প প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে।

তবে ন্যাটো কর্মকর্তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের কারণে ইউরোপীয় সদস্য দেশগুলোর অগ্রাধিকার নির্ধারণ আরও জটিল হয়ে উঠছে।

ন্যাটোর সর্বোচ্চ মিত্র কমান্ডার মার্কিন জেনারেল অ্যালেক্স গ্রিনকেউইচ বার্লিনের একটি এয়ারশোতে বলেন, দ্রুত সংগ্রহ, দ্রুত মোতায়েন এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে দীর্ঘপাল্লার আক্রমণ সক্ষমতা ও ড্রোন প্রযুক্তি বাড়ানোর ওপর তিনি জোর দেন।

তিনি বলেন, ‘এই ধরনের সক্ষমতা আমাদের তাৎক্ষণিক ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করবে, যদি আমাদের প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষার প্রয়োজন হয়।’

অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার ন্যাটো নিয়ে সমালোচনা করেছেন। তিনি জোটকে ‘কাগুজে বাঘ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং ইউরোপীয় দেশগুলো পর্যাপ্ত প্রতিরক্ষা ব্যয় করছে না বলে অভিযোগ করেছেন। তিনি ইউরোপ ও এশিয়ার মিত্র দেশগুলোকে প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ৩.৫ শতাংশে উন্নীত করার আহ্বানও জানিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, আগামী ৭ ও ৮ জুলাই তুরস্কে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ন্যাটো সম্মেলন সম্ভবত জোটের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকগুলোর একটি হতে যাচ্ছে। সেখানে বেশ কিছু বিষয় স্পষ্ট ও সমাধান করা প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

সূত্র: আল-জাজিরা