দিনাজপুরে চালের দাম কেজিতে ৬ টাকা বৃদ্ধি

দেশের শীর্ষ ধান ও চাল উৎপাদনকারী জেলা দিনাজপুরে আকস্মিকভাবে বেড়েছে চালের দাম। মাত্র ২ সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিপ্রতি চালের দাম বেড়েছে ৪ থেকে ৬ টাকা। ধানের ভরা মৌসুমে চালের দামের এমন বৃদ্ধিতে ক্ষুব্ধ সাধারণ ক্রেতারা। সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন খেটে খাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষ।

চালের দাম বৃদ্ধিতে ব্যবসায়ীরা মিলারদের দুষলেও মিলাররা বাজারে ধানের সংকটকে দায়ী করেছেন। মিলারদের দাবি, কৃষকদের কাছে কোনো ধান নেই। ধান চলে গেছে সিন্ডিকেটের কবলে। ফলে সিন্ডিকেট বেশি দামে ধান বিক্রি করছে।

এ সময়ে চালের দাম বাড়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই বলছেন ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ই। এর যৌক্তিক কারণ খুঁজতে ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বাজারে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ধান ও চালের জেলা হিসেবে সুখ্যাতি পাওয়া দিনাজপুরে নতুন ধান উঠেছে এক মাসও হয়নি। এরই মধ্যে চালের বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতি। জেলার সবচেয়ে বড় পাইকারি চালের আড়ত বাহাদুরবাজার এলাকায় গিয়ে জানা যায়, বর্তমানে মিনিকেট জাতের চালের ৫০ কেজির বস্তা বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৪০০ টাকায়। যা দুই সপ্তাহ আগেও বিক্রি হয়েছে ৩ হাজার ১০০ টাকায়। একইভাবে ২ হাজার ২৫০ টাকার ঊনত্রিশ ২ হাজার ৫০০ টাকা, ২ হাজার ২৫০ টাকার সুমন স্বর্ণা জাতের চাল প্রতি বস্তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ টাকা, ২ হাজার ১০০ টাকার গুটি স্বর্ণা বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ২৫০ টাকা, ৭ হাজার টাকার চিনিগুঁড়ার বস্তা বিক্রি হচ্ছে ৭ হাজার ৫০০ টাকায়।

এটা পাইকারি হিসাব। যা খুচরা পর্যায়েও বেড়েছে প্রতি কেজিতে ৩ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ঊনত্রিশ ও মিনিকেট জাতের চালের দাম। খুচরা বাজারে মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে ৭৫ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে, যা গত দুই সপ্তাহ আগেও ছিল ৬৫ থেকে ৬৮ টাকা। ঊনত্রিশ জাতের চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৮ থেকে ৬০ টাকায়, যা ছিল ৫৫ থেকে ৫৭ টাকা টাকায়।

ওই হাটে আসা রামসাগর এলাকার কৃষক আকরাম আলী বলেন, ‘ধান বেচতে গেলে দাম কম, চাল কিনতে গেলে দাম বেশি। আজকে এক রকম দাম, আগামীকালই আরেক রকম। ২ হাজার ৩০০ টাকার সুমন স্বর্ণা চাল এখন ২ হাজার ৫০০ টাকা। এগুলো কার কারসাজি, এগুলো তো মিলারদের কারসাজি। তারা তো পুতুল নাচের মতো বাজার নাচাচ্ছে। সাধারণ মানুষের জন্য কেউ কিছু করে না। বড়লোক চায় আরও বড়লোক হই। গরিব লোক মরলেই কি, বাচলেই কি? খেয়ে থাকুক আর না খেয়ে থাকুক, গরিব মরুক।’

সদরের চেহেলগাজী এলাকার ক্রেতা বশিরুল ইসলাম বলেন, ‘সুমন স্বর্ণা ঈদের আগে কিনেছি ২ হাজার ৩০০ টাকা বস্তা। এখন দাম বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৫০০ টাকা। এটা দেখবে কে?’

অটোরিকশাচালক রহমান আলী বলেন, ‘আমাদের তো আয় বাড়েনি। চালের দাম শুধু বাড়েই, কমে না। চাল ওঠার সময়ও কমে না, অন্য সময়ও কমে না। আর কত দাম বাড়বে? আমরা কীভাবে চলব?’

এদিকে চাল বিক্রেতারা মিল মালিকদের দুষছেন। আর মিল মালিকরা নানা অজুহাত দেখাচ্ছেন। সম্প্রতি জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, বিদ্যুতের লোডশেডি ও বাজারে পর্যাপ্ত ধান না পাওয়াকে কারণ হিসেবে তুলে ধরছেন মিল মালিকরা।

শহরের বাহাদুর বাজারের সৌরভ ট্রেডার্সের মালিক মো. আশরাফ আলী ছুটু বলেন, আমরা মিল গেটে যে দামে চাল কিনি তার থেকে পরিবহন খরচ যোগ করে বস্তাপ্রতি ৩০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত লাভে বিক্রি করি।

দিনাজপুর চাল ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি আজগার আলী বলেন, ‘ধানের দাম বেড়েছে, জ¦ালানির দাম বাড়ায় পরিবহন খরচ বেড়েছে। নতুন করে আবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। তাই মিল গেটে চালের দাম বেড়েছে। সে কারণে ব্যবসায়ীরাও চালের দাম কিছুটা বাড়িয়েছে।’

খুচরা চাল ব্যবসায়ী সুফী রাইস এজেন্সির স্বত্বাধিকারী জাভেদ বলেন, ‘যেভাবে দাম বেড়েছে, তার কারণ মৌসুমি ব্যবসায়ী। তাদের কাছে টাকা আছে, তারা মজুদ করে দাম বাড়িয়েছে। তাদের নাম-ঠিকানা সরকারের কাছে নেই। মিলার ছাড়া যারা ধান মজুদ করেছে তারাই এই দাম বাড়ার কারণ। আমরা যে দামে ক্রয় করি তার চেয়ে কিছু লাভ রেখে বিক্রি করি।’

ব্যবসায়ী ও মিল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলায় মোট মিলের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার। এর মধ্যে প্রায় ৩০০টি অটোরাইস মিল আছে। ধানের ভরা মৌসুমে এসব অটোরাইস মিল থেকেই প্রতিদিন চাল উৎপাদন হয় ৭ থেকে ৮ হাজার টন। কিন্তু বর্তমানে ইরি-বোরো মৌসুম প্রায় শেষের দিকে, বাজারে ধানের আমদানি কম। ফলে দৈনিক উৎপাদন হচ্ছে ৩ থেকে ৪ হাজার টন। অর্থাৎ ধান থেকে চাল উৎপাদন কমেছে ৫০-৫৮ শতাংশ। তার পরে আবার জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবহন খরচ বেড়েছে। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে মেশিনপত্র নষ্ট হলে তার খরচটা পড়ে চাল উৎপাদনের ওপর। আবার নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। এতেও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে।

বাংলাদেশ মেজর, অটো ও হাসকিং মিল মালিক সমিতির সহসভাপতি সহিদুর রহমান পাটোয়ারী মোহন বলেন, ‘ধানের দাম বাড়লে চালের দাম বাড়ে। ধানের দাম বাড়–ক এটা আমরা চাই, এতে করে কৃষকরা লাভবান হবেন। কিন্তু বর্তমানে ধানের দাম বৃদ্ধিতে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন না। কারণ অধিকাংশ কৃষকের ঘরে এখন ধান নেই। এক শ্রেণির অসাধু মজুদদার ধান কিনে এখন বেশি দামে বিক্রি করছেন। এ ছাড়া ঘন ঘন লোডশেডিং, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি ও বিদ্যুতের দাম  বৃদ্ধিতে চালের উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে যাবে।’

এ ব্যাপারে দিনাজপুরের জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘কৃষকরা সরকারকে ধান দিচ্ছে। আর মিলাররা বাজার থেকে ধান কিনে চাল উৎপাদন করবে। কেউ যদি অবৈধভাবে মজুদ করে তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে সজাগ রয়েছে।’