দ্বন্দ্ব নিরসনে কোরআনের বার্তা

মানুষ সামাজিক জীব। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা কর্মক্ষেত্র, সর্বত্রই মানুষকে অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়। কিন্তু সম্পর্ক যেখানে আছে, সেখানে মতপার্থক্য, ভুল বোঝাবুঝি ও দ্বন্দ্বও দেখা দিতে পারে। পৃথিবীর শুরু থেকেই মানুষের মধ্যে বিরোধ ও সংঘাত বিদ্যমান। তবে দ্বন্দ্বকে কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে, কীভাবে শত্রুতাকে বন্ধুত্বে রূপান্তর করা যায় এবং কীভাবে ভাঙনের পরিবর্তে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা যায়, সেই বিষয়ে কোরআন মানবজাতিকে অনন্য শিক্ষা দিয়েছে।

আজকের পৃথিবীতে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনের বহু সংকটের মূলে রয়েছে প্রতিশোধপ্রবণতা, অহংকার, অসহিষ্ণুতা এবং ক্ষমাহীন মনোভাব। মানুষ অপমানের জবাবে অপমান, অন্যায়ের জবাবে অন্যায় এবং কটু কথার জবাবে আরও কটু কথা বলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে দ্বন্দ্বের আগুন নেভার পরিবর্তে আরও ছড়িয়ে পড়ে। এমন বাস্তবতায় কোরআনের শিক্ষা মানবজাতির জন্য শান্তি ও সম্প্রীতির এক মহৎ দিকনির্দেশনা।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘ভালো ও মন্দ সমান হতে পারে না। তুমি মন্দ দূর করো তা দিয়ে, যা উত্তম। ফলে যার সঙ্গে তোমার শত্রুতা রয়েছে, সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো।’ (সুরা ফুসসিলাত ৩৪)

এই আয়াত কোরআনের অন্যতম বিস্ময়কর সামাজিক নির্দেশনা। সাধারণ মানুষের প্রবণতা হলো, কেউ খারাপ আচরণ করলে তার প্রতিদান একইভাবে দেওয়া। কিন্তু কোরআন মানুষকে আরও উচ্চতর নৈতিকতার দিকে আহ্বান করেছে। এখানে শুধু অন্যায়ের প্রতিশোধ না নেওয়ার কথা বলা হয়নি, বরং অন্যায়ের মোকাবিলায় উত্তম আচরণ করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ কেউ কটু কথা বললে তার জবাবে নম্রতা, কেউ অন্যায় করলে তার বিপরীতে ন্যায়, কেউ বিদ্বেষ দেখালে তার পরিবর্তে সৌজন্য ও সদাচরণ প্রদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মানুষের হৃদয় স্বভাবতই ভালোবাসা, সহানুভূতি ও সম্মানের প্রতি আকৃষ্ট হয়। অনেক সময় কঠোর আচরণ কঠোরতাকে বাড়িয়ে দেয়, কিন্তু কোমল আচরণ মানুষের অন্তর পরিবর্তন করে দেয়। এ কারণেই কোরআন বলেছে, উত্তম আচরণ শত্রুকেও অন্তরঙ্গ বন্ধু বানিয়ে দিতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন এ আয়াতের বাস্তব উদাহরণ। মক্কার মুশরিকরা তাকে উপহাস করেছে, নির্যাতন করেছে, তার অনুসারীদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছে। কিন্তু তিনি প্রতিশোধের পথ বেছে নেননি। মক্কা বিজয়ের দিন তার সামনে সেসব মানুষ উপস্থিত ছিল, যারা দীর্ঘদিন তার শত্রুতা করেছে। তিনি চাইলে তাদের শাস্তি দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তাদের ক্ষমা করে দেন। এই মহান ক্ষমাশীলতা হাজারো মানুষের হৃদয় জয় করেছিল। যারা একসময় ইসলামের বিরোধিতা করেছিল, তাদের অনেকেই পরবর্তীকালে ইসলামের অন্যতম শক্তিশালী সমর্থকে পরিণত হয়।

কোরআন শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কেই নয়, সামাজিক বিরোধ নিরসনের ক্ষেত্রেও সমঝোতা ও সম্প্রীতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘মুমিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই। অতএব তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও।’ (সুরা হুজুরাত ১০)

এই আয়াত মুসলিম সমাজে ঐক্য ও সংহতির ভিত্তি স্থাপন করেছে। দ্বন্দ্ব দেখা দিলে পক্ষ নেওয়া, উত্তেজনা ছড়ানো বা বিরোধ বাড়ানোর পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা করা একজন মুমিনের দায়িত্ব। কারণ বিরোধ যত দীর্ঘ হয়, ততই সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সমাজে বিভাজন সৃষ্টি হয়।

ক্ষমাশীলতা দ্বন্দ্ব নিরসনের অন্যতম কার্যকর উপায়। কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা যেন তাদের ক্ষমা করে এবং তাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি উপেক্ষা করে। তোমরা কি পছন্দ করো না যে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দেন? আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা নুর ২২)

লেখক : ইসলামি গবেষক