মানুষ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। বর্ণ, ভাষা, গোত্র, জাতি কিংবা ভৌগোলিক অবস্থানের ভিন্নতা থাকলেও মানবজাতির মৌলিক পরিচয় এক ও অভিন্ন। ইতিহাসের পাতায় দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ে মানুষ নিজেই মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছে। কখনো বর্ণের ভিত্তিতে, কখনো জাতিগত পরিচয়ের কারণে, কখনো ভাষা বা গোত্রের অজুহাতে একদল মানুষ অন্য দলকে হেয় করেছে। এর ফলে জন্ম নিয়েছে বৈষম্য, সংঘাত, নিপীড়ন ও মানবিক সংকট। এমন এক বাস্তবতায় ইসলাম মানবজাতির সামনে সাম্য, মর্যাদা ও ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য আদর্শ উপস্থাপন করেছে।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে, অতঃপর তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাবান, যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকি বা আল্লাহভীরু।’ (সুরা হুজুরাত ১৩)
এই আয়াত মানবসভ্যতার ইতিহাসে সাম্য ও মানবিক মর্যাদার অনন্য ঘোষণা। এখানে মহান আল্লাহ মানুষকে তাদের জাতিগত পরিচয়ে নয়, বরং তাদের অভিন্ন উৎসের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। পৃথিবীর সব মানুষ একই পিতা আদম (আ.) এবং একই মাতা হাওয়া (আ.)-এর সন্তান। সুতরাং জন্মগত পরিচয়ের ভিত্তিতে এক মানুষ অন্য মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হতে পারে না।
ইসলামের আগমনের পূর্বে পৃথিবীর বিভিন্ন সমাজে বর্ণবাদ ও জাতিগত অহংকার ছিল প্রবল। আরব সমাজেও গোত্রীয় গর্ব ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। মানুষ নিজের গোত্রকে শ্রেষ্ঠ এবং অন্যদের নিকৃষ্ট মনে করত। শক্তিশালী গোত্র দুর্বলদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করত। ইসলাম এসে এই মানসিকতার মূলে আঘাত হানে। কোরআন ঘোষণা করে, মানুষের মর্যাদার মানদণ্ড বংশ, সম্পদ কিংবা ক্ষমতা নয়, বরং তাকওয়া।
জাতি ও গোত্রের বৈচিত্র্যকে ইসলাম কোনো বিভেদের কারণ হিসেবে দেখেনি। বরং এটিকে আল্লাহর সৃষ্টির একটি নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করেছে। পৃথিবীতে বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব মানুষের পারস্পরিক পরিচয়, সহযোগিতা ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধির জন্য। যদি সবাই একই রকম হতো, তাহলে মানবসভ্যতার বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্য প্রকাশ পেত না। তাই ইসলাম বৈচিত্র্যকে স্বীকার করে, কিন্তু বৈষম্যকে প্রত্যাখ্যান করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) তার বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে মানবিক সাম্যের এই শিক্ষাকে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘কোনো আরবের ওপর অনারবের এবং কোনো অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কোনো শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের এবং কোনো কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, তবে তাকওয়ার মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জিত হতে পারে।’ (মুসনাদ আহমাদ)
এই ঘোষণা মানব ইতিহাসে বর্ণবাদবিরোধী সবচেয়ে শক্তিশালী বার্তাগুলোর একটি। এমন সময়ে এই ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, যখন পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষকে জন্মগত পরিচয়ের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হতো। ইসলাম সেই ধারণাকে ভেঙে দিয়ে মানুষের প্রকৃত মর্যাদাকে নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত করেছে।
ইসলামের ইতিহাসে হজরত বিলাল (রা.)-এর ঘটনা মানবিক সাম্যের উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি ছিলেন আফ্রিকান বংশোদ্ভূত একজন দাস। ইসলাম গ্রহণের কারণে তাকে কঠোর নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল। কিন্তু ইসলাম তাকে এমন মর্যাদা দিয়েছিল যে, তিনি ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন হওয়ার সম্মান লাভ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তার সম্পর্কে গভীর ভালোবাসা ও সম্মান প্রকাশ করেছেন। এটি প্রমাণ করে, ইসলামে মানুষের মূল্য তার বংশ বা গায়ের রঙে নয়, বরং তার ইমান ও চরিত্রে।
মানবিক সাম্য প্রতিষ্ঠার পর ইসলাম আভিজাত্য এবং সামাজিক মর্যাদার পরিমাপক হিসেবে সম্পূর্ণ নতুন এক মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছে। সমাজে সাধারণত সম্পদ, ক্ষমতা, বংশমর্যাদা বা গায়ের রঙ দেখে মানুষের সম্মান করা হয়। কিন্তু আল্লাহর দরবারে এই পার্থিব ও নশ্বর উপাদানগুলোর কোনো মূল্য নেই। মহান আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তিই সবচেয়ে বেশি মর্যাদাবান, যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহভীরু। তাকওয়া বা আল্লাহভীতি হলো মানুষের ভেতরের সেই আধ্যাত্মিক শক্তি, যা তাকে অন্যায় থেকে দূরে রাখে এবং সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ হতে সাহায্য করে।
গায়ের কালো রঙের একজন ক্রীতদাস যদি অন্তরে প্রগাঢ় আল্লাহভীতি ধারণ করেন, তবে তিনি আল্লাহর দরবারে সাদা চামড়ার কোনো অহংকারী রাজপুত্রের চেয়ে কোটি গুণ বেশি সম্মানিত। মর্যাদার এই ঐশী পরিমাপক মানুষের তৈরি সমস্ত বৈষম্যমূলক সামাজিক কাঠামোকে ভেঙে চুরমার করে দেয় এবং সমাজে এমন এক মানসিকতার জন্ম দেয়, যেখানে প্রতিটি মানুষ তার চরিত্রের মাধুর্য দিয়ে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের যুগেও আমরা যদি বিশ্বের দিকে তাকাই, তবে দেখতে পাই বর্ণবাদ এবং জাতিভেদের এক বীভৎস রূপ। উন্নত বিশ্বে আজও চামড়ার রঙের কারণে মানুষকে হেনস্তা হতে হচ্ছে, কৃষ্ণাঙ্গরা শ্বেতাঙ্গদের দ্বারা নির্মমতার শিকার হচ্ছে। ক্ষমতার দাপটে এক জাতি অন্য জাতির ওপর আধিপত্য বিস্তার করছে, জাতিগত নিধনের মতো জঘন্য অপরাধ সগৌরবে ঘটে চলেছে।
অন্যদিকে, আমাদের এই উপমহাদেশে হাজার বছরের পুরনো জাতপ্রথা এবং সামাজিক শ্রেণিবিভাগ আজও মানুষকে মানুষের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখছে। এই মানবিকতাহীন বিশ্বে ইসলামি দর্শনের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি অনুভূত হচ্ছে। ইসলামের এই সাম্যের বাণী যদি আজ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ও সমাজ জীবনে অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা যেত, তবে বিশ্বজুড়ে চলমান এই জাতিগত সংঘাত, উদ্বাস্তু সমস্যা এবং মানবিক সংকটের স্থায়ী অবসান ঘটানো সম্ভব হতো।
ইসলাম কেবল সাম্যের বাণী প্রচার করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং তা রক্ষার জন্য কিছু বাধ্যতামূলক ইবাদত ও সামাজিক বিধান নিশ্চিত করেছে। প্রতিদিন পাঁচবার জামায়াতের সঙ্গে নামাজ আদায়ের সময় রাজা ও প্রজা, ধনী ও দরিদ্র, মালিক ও শ্রমিক কোনো ভেদাভেদ ছাড়াই একই কাতারে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ায়। এখানে কারও জন্য কোনো সংরক্ষিত আসন নেই, আগে যে আসবে সেই প্রথম কাতারে দাঁড়াবে। হজ পালন করার সময় বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা লাখো মানুষ সমস্ত পার্থিব জাঁকজমক পরিহার করে একই রঙের দুটি সাদা কাপড় পরিধান করে সমবেত হয়। হজের এই দৃশ্য যেন পৃথিবীর বুকেই এক মিনি হাশরের ময়দান, যেখানে জাত, পাত, ভাষা কিংবা দেশের কোনো সীমানা থাকে না। থাকে শুধু স্রষ্টার প্রতি বান্দার নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। এছাড়া জাকাত ও সদকার মাধ্যমে সমাজের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে সম্পদ কেবল ধনীদের মাঝেই আবর্তিত না হয়।
মানবিক সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব রক্ষার এই আদর্শকে টিকিয়ে রাখতে হলে সমাজে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার এবং মর্যাদা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। ইসলাম শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের প্রতি যে সহমর্মিতা দেখিয়েছে, তা সত্যিই অতুলনীয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, ‘শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি পরিশোধ করে দাও।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ) তিনি আরও বলেছেন, ‘যারা তোমাদের অধীনে কাজ করে, তারা তোমাদেরই ভাই। আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীনস্ত করেছেন। অতএব, যার অধীনে তার কোনো ভাই কাজ করে, সে যেন তাকে তাই খাওয়ায় যা সে নিজে খায় এবং তাই পরায় যা সে নিজে পরে।’ (সহিহ বুখারি)
এর চেয়ে সামাজিক ভ্রাতৃত্বের সুন্দর এবং মানবিক উদাহরণ আর কী হতে পারে! এই নির্দেশনাগুলো সমাজে মালিক ও শ্রমিকের মধ্যকার শোষণের চিরন্তন সম্পর্কের অবসান ঘটিয়ে এক সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করে।
পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজে মানবিক সাম্যের এই শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। শিশুদের শেখাতে হবে যে মানুষের গায়ের রঙ, ভাষা বা জাতিগত পরিচয় নয়, বরং তার চরিত্র, জ্ঞান ও নৈতিকতাই প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করে। সামাজিক সম্পর্কেও পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা ও সহযোগিতার চর্চা বাড়াতে হবে।
ইসলাম এমন একটি সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যেখানে ধনী-গরিব, শক্তিশালী-দুর্বল, শাসক-শাসিত সবাই আইনের দৃষ্টিতে সমান মর্যাদা লাভ করবে। সেখানে কোনো মানুষ শুধু তার পরিচয়ের কারণে অবহেলিত হবে না এবং কোনো গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীর ওপর অন্যায় আধিপত্য বিস্তার করবে না।
মানবিক সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব ইসলামের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা। কোরআন ও সুন্নাহ মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে আমরা সবাই একই উৎস থেকে আগত এবং একই প্রভুর বান্দা। জাতি, ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য বিভেদের জন্য নয়, বরং পারস্পরিক পরিচয় ও সহযোগিতার জন্য। তাই একজন মুসলমানের দায়িত্ব হলো সব ধরনের বর্ণবাদ, জাতিগত অহংকার ও বৈষম্য পরিহার করে মানবিক মর্যাদা ও ভ্রাতৃত্বের মূল্যবোধকে ধারণ করা। ব্যক্তি ও সমাজজীবনে এই শিক্ষা বাস্তবায়িত হলে পৃথিবী আরও শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক এবং মানবিক হয়ে উঠবে।
লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ইসলামি গবেষক