রুপালি পর্দায় ফুটবল

বিশ্বজুড়ে চলছে ফুটবল উন্মাদনা। ফুটবলকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে অনেক সিনেমা। আমাদের ‘দামাল’, ‘জাগো’ থেকে শুরু করে বিশ্ব ফুটবলের বিখ্যাত সিনেমা ও প্রামাণ্যচিত্র নিয়ে আজকের আয়োজন। লিখেছেন তারেক আনন্দ দামাল

বাংলাদেশের ফুটবল ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরেছে ২০২২ সালের চলচ্চিত্র ‘দামাল’। রায়হান রাফী পরিচালিত এই সিনেমাটি স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত। বাস্তব ইতিহাসের পাশাপাশি এতে কিছু কল্পনিক ও নাটকীয় উপাদানও যুক্ত করা হয়েছে। ইমপ্রেস টেলিফিল্ম প্রযোজিত এ ছবিতে সিয়াম আহমেদ, শরিফুল রাজ এবং বিদ্যা সিনহা মিম অভিনয় করেছেন। ফুটবল কীভাবে একটি দেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে জনমত গঠনের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে, সেই অনন্য ইতিহাসই এই সিনেমা।

জাগো

বাংলাদেশে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে নির্মিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি ২০১০ সালের ‘জাগো’। খিজির হায়াৎ খান পরিচালিত এই ক্রীড়াভিত্তিক চলচ্চিত্র এদেশের ফুটবলপ্রেমীদের মনে দারুণ দাগ কেটেছিল। ছবির গল্পে দেখা যায়, ভারতের ত্রিপুরা একাদশের বিপক্ষে প্রতি বছরই হেরে যাওয়া কুমিল্লা একাদশকে নতুন করে জাগিয়ে তোলেন ফুটবল পাগল তরুণ শামীম। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়াড় সাফুর জাদুকরী কোচিং আর একঝাঁক তরুণের অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে ভর করে কীভাবে তারা বিজয়ের লাল-সবুজ পতাকা ওড়ায়, তা-ই এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ফেরদৌস ও বিন্দুর চমৎকার অভিনয় করেছে। এছাড়া আরিফিন শুভ, রওনক হাসান, নাঈম ও জ্যোতিকা জ্যোতির ছিল অনবদ্য পারফরম্যান্স।

গোল

ফুটবলভিত্তিক অন্যতম চলচ্চিত্র ২০০৫ সালের ‘গোল! দ্য ড্রিম বিগিন্স’। লস অ্যাঞ্জেলেসে বসবাসকারী এক মেক্সিকান অভিবাসী তরুণের ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলার স্বপ্নপূরণের গল্প নিয়ে নির্মিত সিনেমাটি সাড়া ফেলেছিল। পরে এর আরও দুটি সিক্যুয়েল নির্মিত হয়। ছবিটির অন্যতম আকর্ষণ ডেভিড বেকহ্যাম, জিনেদিন জিদান ও রাউলের মতো ফুটবল কিংবদন্তিদের উপস্থিতি।

বেন্ড ইট লাইক বেকহ্যাম

২০০২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ব্রিটিশ চলচ্চিত্র ‘বেন্ড ইট লাইক বেকহ্যাম’ নারীদের ফুটবল নিয়ে নির্মিত সবচেয়ে সফল সিনেমাগুলোর একটি। পারমিন্দর নাগরা ও কেইরা নাইটলি অভিনীত এই স্পোর্টস কমেডি-ড্রামায় দেখানো হয়েছে কীভাবে সামাজিক ও পারিবারিক বাধা অতিক্রম করে এক তরুণী ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করে। ডেভিড বেকহ্যামের বিখ্যাত ফ্রি-কিক দক্ষতার নামানুসারে চলচ্চিত্রটির নামকরণ করা হয়। এটি কেবল ক্রীড়াভিত্তিক সিনেমা নয়, বরং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধেও একটি শক্তিশালী বক্তব্য।

শাওলিন সকার

ফুটবল ও মার্শাল আর্টের অভিনব মিশেলে ‘শাওলিন সকার’ অনন্য। ২০০১ সালে স্টিফেন চও পরিচালিত এই হংকং চলচ্চিত্রে শাওলিন কুংফুর কৌশল ব্যবহার করে ফুটবল ম্যাচ জেতার হাস্যরসাত্মক গল্প তুলে ধরা হয়েছে। অসাধারণ ভিজ্যুয়াল এফেক্ট এবং কল্পনাপ্রসূত দৃশ্যায়নের কারণে এটি বিশ্বজুড়ে কাল্ট ক্ল্যাসিকের মর্যাদা পেয়েছে।

দ্য ড্যামড ইউনাইটেড

২০০৯ সালের ব্রিটিশ স্পোর্টস ড্রামা ‘দ্য ড্যামড ইউনাইটেড’ ফুটবল মাঠের বাইরের জগৎকে তুলে ধরে। সিনেমাটি ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি ম্যানেজার ব্রায়ান ক্লাফের লিডস ইউনাইটেডে দায়িত্ব পালনকালের নাটকীয় ৪৪ দিনের কাহিনি নিয়ে নির্মিত। মাইকেল শিনের শক্তিশালী অভিনয় এবং ফুটবল রাজনীতির সূক্ষ্ম উপস্থাপন চলচ্চিত্রটিকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে।

ভিক্টরি

১৯৮১ সালে জন হাস্টন পরিচালিত ‘ভিক্টরি’ ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত কাল্ট ক্ল্যাসিক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই সিনেমায় নাৎসি বন্দিশিবিরে থাকা যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গে জার্মান দলের একটি ফুটবল ম্যাচের গল্প দেখানো হয়েছে। সিলভেস্টার স্ট্যালোন ও মাইকেল কেইনের পাশাপাশি এতে অভিনয় করেছেন পেলে ও ববি মুরের মতো কিংবদন্তি ফুটবলাররাও।

দ্য বিউটিফুল গেম

২০২৪ সালের ব্রিটিশ স্পোর্টস ড্রামা ‘দ্য বিউটিফুল গেম’ বাস্তব ‘হোমলেস ওয়ার্ল্ড কাপ’ টুর্নামেন্ট থেকে অনুপ্রাণিত। এর মূল চরিত্র ও কাহিনি কাল্পনিক, তবুও এটি গৃহহীন মানুষের জীবনে ফুটবলের ইতিবাচক প্রভাবকে হৃদয়স্পর্শীভাবে তুলে ধরে। বিল নাই ও মাইকেল ওয়ার্ড অভিনীত এই সিনেমায় দেখানো হয়েছে কীভাবে ফুটবল অনেকের জন্য নতুন জীবনের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

পেলে : বার্থ অব এ লিজেন্ড

২০১৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘পেলে : বার্থ অব এ লিজেন্ড’ ফুটবল সম্রাট পেলের শৈশব এবং ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপ জয়ের গল্পকে কেন্দ্র করে নির্মিত। ব্রাজিলের দরিদ্র পরিবেশ থেকে উঠে এসে কীভাবে তিনি বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন, তা এই চলচ্চিত্রে তুলে ধরা হয়েছে। চলচ্চিত্রটির আবেগঘন পরিবেশ নির্মাণে এ আর রহমানের সংগীত বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।

দিয়েগো ম্যারাডোনা

অস্কারজয়ী পরিচালক আসিফ কাপাদিয়ার ২০১৯ সালের প্রামাণ্যচিত্র ‘দিয়েগো ম্যারাডোনা’ ফুটবল বিষয়ক অন্যতম সেরা ডকুমেন্টারি হিসেবে বিবেচিত হয়। পাঁচ শতাধিক ঘণ্টার আর্কাইভ ফুটেজের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত এই কাজটি মূলত নাপোলিতে ম্যারাডোনার উত্থান, সাফল্য এবং বিতর্কিত জীবনকে তুলে ধরা। এতে তার গৌরবময় অর্জনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত সংগ্রাম ও বিতর্কের দিকগুলোও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

মেসি

২০১৪ সালের স্প্যানিশ ডকু-ড্রামা ‘মেসি’ আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসির জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তুলে ধরে। পরিচালক অ্যালেক্স ডি লা ইগলেসিয়া নির্মিত এই প্রামাণ্যচিত্রে মেসির শৈশব, শারীরিক সমস্যার বিরুদ্ধে লড়াই এবং বিশ্বসেরাদের একজন হয়ে ওঠার যাত্রা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। শৈশব থেকেই তার অসাধারণ প্রতিভা ও ফুটবল বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া গিয়েছিল, যা পরবর্তী সময় তাকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ে পরিণত করে।