চুক্তির বিরোধিতায় ইরানে বিক্ষোভ

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের ১০০ দিন পেরোলেও, উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাত স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে কোনো শান্তিচুক্তিতে পৌঁছতে পারেনি কোনো পক্ষই। উল্টো ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির আবহেই বিক্ষিপ্তভাবে ওয়াশিংটন-তেহরান একে অপরকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোয় নতুন করে যুদ্ধের দামামা বাজছিল। গতকাল রবিবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, পশ্চিম এশিয়ার তেলসমৃদ্ধ অঞ্চলটিতে চলমান যুদ্ধ অবসানে একটা দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সমঝোতা স্মারক সইয়ের খুব কাছাকাছি অবস্থায় এসেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের নেতারাও তেমনই পূর্বাভাস দিয়েছেন। শান্তিচুক্তির খবরে বিশ্বজুড়ে স্বস্তির বাতাস ফিরেছে।

তবে সম্ভাব্য এই সমঝোতা চুক্তি যখন সইয়ের দ্বারপ্রান্তে, তখন এর বিরোধিতা করে ইরানে বিক্ষোভ হয়েছে। গত শনিবার ইরানের রাজধানী তেহরান এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে কট্টরপন্থিরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছে। তেহরানে বিক্ষোভকারীরা সেন্ট্রাল স্কয়ারে জড়ো হয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং পার্লামেন্ট স্পিকার বাঘের গালিবাফের বিরুদ্ধে সেøাগন দিয়েছে। ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সির প্রকাশিত এক ভিডিওতে দেখা যায়, কালো চাদরপরা কয়েকজন নারী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে ‘আরাগচি নিপাত যাক’ বলে সেøাগান দিচ্ছেন; তাদের হাতে ছিল ইরানের পতাকা। অনেকেই চিৎকার করে বলেছে, ‘আরাগচির লজ্জিত হওয়া এবং দেশ ছাড়া উচিত’। অন্যরা সেøাগান দেয়, ‘গালিবাফ, আরাগচি- আমাদের নেতাদের রক্তের কী হবে?’ এর আগে গত শুক্রবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি নিয়ে সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। চুক্তির খসড়ায় ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহারের কথা রয়েছে বলে আরাগচি জানিয়েছিলেন। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের আরোপিত অবরোধের জবাবে যুক্তরাষ্ট্র এই অবরোধ দিয়েছিল। আরাগচি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা আগের মতো থাকবে না। তিনি এই জলপথকে ইরানের ‘প্রধান প্রতিরোধমূলক হাতিয়ারগুলোর একটি’ বলে উল্লেখ করেন।

ইরানের কট্টরপন্থিদের দাবি, আলোচিত চুক্তিটি দেশটির স্বার্থরক্ষা করবে না। তাদের মতে, চুক্তি কার্যকর হলে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরানের কৌশলগত প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়বে। চুক্তি করতে গিয়ে ইরানের আলোচকরা যুক্তরাষ্ট্রকে অতিরিক্ত ছাড় দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে অনেক রাজনীতিকের। সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে ইরানের ভেতরে রাজনৈতিক বিভাজন ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একদিকে সরকার যুদ্ধের অবসান ও অর্থনৈতিক চাপ কমানোর সুযোগ দেখছে, অন্যদিকে কট্টরপন্থিরা মনে করছেন, এতে তাদের কৌশলগত প্রভাব কমছে। কাতারের মালিকানাধীন পত্রিকা আল-আরাবি আল-জাদিদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তির বিরোধিতায় বিক্ষোভে নামা কর্মী ও আইনপ্রণেতাদের বেশিরভাগই ইরানের রক্ষণশীল শিবিরের, তারা বিশেষ করে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সাবেক সেক্রেটারি সাঈদ জলিলির ঘনিষ্ঠ মহলের লোক।

এই বিরোধিতার মধ্যে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাই জলদি চুক্তি সইয়ের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। তিনি বলেন, রবিবার চুক্তি সই হবে না। তবে এ বিষয়ে আগামী দিনগুলোতে আরও অগ্রগতির সম্ভাবনার কথা বলেন তিনি। ইরানের আধা সরকারি ফার্স বার্তা সংস্থা এক সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে, প্রস্তাবিত চুক্তির বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তেহরান এখনো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বিশেষজ্ঞ-পর্যায় এবং উচ্চ-পর্যায়ে আলোচনা জারি রেখে খসড়া চুক্তির রাজনৈতিক, আইনি এবং কৌশলগত দিক পর্যালোচনা করে দেখছে। এর আগে, গত ১৩ জুন এক্স বার্তায় মুখপাত্র বাঘাই বলেছিলেন আগ্রাসনকারীরা বিজয় নিশ্চিত করতে পারবে, এমন ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে আক্রমণ শুরু করেছিল। তারা এমন একটি জাতির বিরুদ্ধে অতর্কিত আক্রমণের পথ খুলেছিল যাদের প্রতিরোধ ও শত্রু পরাজিত করার নজির ইতিহাসে সুপ্রতিষ্ঠিত।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ইরানের রক্ষকদের কাপুরুষোচিত হত্যাকাণ্ড এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলোয় হামলার মাধ্যমে আক্রমণ শুরু করেছিল। কিন্তু আগ্রাসীরা শেষ পর্যন্ত তাদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়। ইরানি জাতির দৃঢ় সংকল্প, প্রতিরোধ ও আত্মত্যাগ শত্রুর উচ্চাকাক্সক্ষাকে পরাজয় ও লজ্জায় রূপান্তরিত করে। এসমাইল বাঘাই আরও বলেন, এমনকি আগ্রাসনকারীদের পেছনে যারা ছিল তারাও এখন স্বীকার করেছে যে তারা তাদের উদ্দেশ্য অর্জন ছাড়াই প্রাপ্য সব উপায়গুলো নিঃশেষ করে ফেলেছে। এই সংঘাতের ফলাফল ইরানের প্রভাব, অধ্যবসায় ও মর্যাদা অন্বেষণের এক স্থায়ী উদাহরণ হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।