ইরানে বাড়ছে চরম দারিদ্র্য

ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে জড়িয়ে পড়ছে হাজারো শিশু

ইরানে অর্থনৈতিক সংকট ও দারিদ্র্য তীব্র আকার ধারণ করায় দেশটিতে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে শিশুশ্রম। চরম জীবিকার তাগিদে শিশুরা এমন সব ঝুঁকিপূর্ণ কাজে বাধ্য হচ্ছে, যা তাদের যৌন শোষণ, সহিংসতা ও তীব্র অপুষ্টির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। গতকাল রবিবার (১৪ জুন) ইরানের সোশ্যাল ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশনের (সমাজকর্মী সমিতি) প্রধান হাসান মুসাভি চালাক এই মারাত্মক পরিস্থিতির বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন।

ইরানি গণমাধ্যম ‘খবার অনলাইন’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হাসান মুসাভি চালাক জানান, দেশের ক্রমাগত অবনতিশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বহু পরিবার তাদের মৌলিক চাহিদা মেটাতে বাধ্য হয়ে সন্তানদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

তিনি বলেন, ‌‘আমাদের এটি মেনে নিতেই হবে যে, ইরানে দারিদ্র্য আরও জেঁকে বসেছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যত কঠিন হচ্ছে, পরিবারের খরচ জোগাতে শিশুদের শ্রমের সক্ষমতাকে ব্যবহার করার প্রবণতা ততটাই বাড়ছে।’

এই মানবিক সংকটকে ধামাচাপা দেওয়ার রাজনৈতিক চেষ্টার তীব্র সমালোচনা করে মুসাভি বলেন, শিশুশ্রমের ভয়াবহতা কেবল শহরের রাস্তায় দৃশ্যমান শিশুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি জানান, কসাইখানা, গবাদিপশুর খামার, ভূগর্ভস্থ গোপন কারখানা, ফলের বাগান, কৃষি খামার এবং বিভিন্ন শিল্প কারখানায় বিপুলসংখ্যক শিশুকে শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। জন চক্ষুর অন্তরালে থাকা এই শিশুরা চরম বিপজ্জনক ও ক্ষতিকর কর্মপরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে।

ইরানে বর্তমানে ঠিক কতসংখ্যক শিশুশ্রমিক রয়েছে, তার নির্ভরযোগ্য কোনো পরিসংখ্যান নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, তবে বড় বড় শহর, ধর্মীয় তীর্থস্থান এবং পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে।

হাসান মুসাভি চালাক জানান, কর্মজীবী শিশুরা স্কুলের নিরাপদ পরিবেশ এবং স্বাভাবিক সামাজিকীকরণের সুযোগ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে বেঁচে থাকার তাগিদে তারা রাস্তার নিষ্ঠুর পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে এবং অনেক সময় বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ আচরণে জড়িয়ে পড়ছে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, এই শিশুশ্রমিকেরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তারা অপুষ্টি, চর্মরোগ, সংক্রামক ব্যাধি, গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল (পরিপাকতন্ত্রের) সমস্যা এবং মাদকের নেশায় আক্রান্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে তারা নানামুখী সহিংসতা ও যৌন শোষণের শিকার হচ্ছে।

সামাজিক বৈষম্যের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব তুলে ধরে মুসাভি বলেন, ‘সামাজিক তুলনাও এই শিশুদের জন্য চরম ক্ষতিকর। একটি শিশু যখন নিজেকে অন্য শিশুদের সঙ্গে তুলনা করে এবং দেখে যে তার সমবয়সীরা পরিবারের সঙ্গে একটি স্বাভাবিক ও সুখী জীবন কাটাচ্ছে, তখন সে তীব্র মানসিক চাপ ও আবেগময় যন্ত্রণায় ভোগে।’

তিনি আরও হুঁশিয়ারি দেন যে, অর্থনৈতিক সংকটের কারণে শিশুরা অনেক সময় ‘এমনকি তাদের সবচেয়ে কাছের মানুষদের’ মাধ্যমেও শোষণের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে ইরানের বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক চিত্র ফুটে উঠেছে। দেশটির সাধারণ নাগরিকেরা ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী দাম এবং দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক স্থবিরতার কথা জানাচ্ছেন।

‘ইরান ইন্টারন্যাশনাল’-এ পাঠানো বিভিন্ন বার্তায় সাধারণ মানুষ জানিয়েছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়ায় পারিবারিক বাজেটের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এটি মানুষের জীবিকা এবং শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।

২০২৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দারিদ্র্য, অভিবাসন এবং প্রান্তিককরণের পাশাপাশি অকার্যকর সহায়তা নীতির কারণে ইরানের স্থানীয় শিশু এবং আফগান শরণার্থী শিশু উভয় পক্ষই রাস্তাঘাটে ও বিভিন্ন কারখানায় কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে।

গবেষণাটিতে উল্লেখ করা হয়, শিশুশ্রমকে একটি ত্রুটিপূর্ণ অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে শিশুদের খাটিয়ে মুনাফা লোটার ফাঁদ হিসেবে দেখা উচিত। দেশের ভঙ্গুর কল্যাণমূলক ব্যবস্থা এবং সামাজিক হস্তক্ষেপের ব্যর্থতার কারণে রাষ্ট্রীয় সহায়তার বিকল্প হিসেবে এই শিশুদের শেষ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে রাজপথ।

শিশুশ্রমে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের জড়িত থাকার বিষয়ে মুসাভি বলেন, শিশুশ্রম খাতে মাফিয়া-সদৃশ নেটওয়ার্ক বা চক্রের অস্তিত্বকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না, বিশেষ করে গৃহহীন শিশুদের ক্ষেত্রে। তবে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা সব কর্মজীবী শিশুই এই ধরনের চক্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এমন ধারণাকে সমর্থন করে না।

তিনি জানান, অনেক শিশুই তাদের পরিবারের মাধ্যমে দরিদ্র প্রদেশগুলো থেকে অপেক্ষাকৃত ধনী অঞ্চলে আসে, যাতে তারা পরিবারের খরচ চালাতে সাহায্য করতে পারে।

মুসাভি বলেন, কিছু শিশু, বিশেষ করে যাদের কোনো অভিভাবক বা কার্যকর যত্ন নেওয়ার কেউ নেই, তারা এই ধরনের অপরাধী চক্রের খপ্পরে পড়তে পারে। আর এমন পরিস্থিতিতে, তাদের জোরপূর্বক বিভিন্ন অবৈধ বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে ফেলা হতে পারে।

সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল