বেনজীর আহমেদের জালিয়াতি-দুর্নীতির নথি যাচ্ছে দুবাইয়ে

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে তার জালিয়াতি ও দুর্নীতির সমস্ত নথিপত্র পাঠানোর জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক এই অনুরোধপত্র পাঠাতে হবে।

দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রত্যর্পণ প্রস্তাব তৈরির কাজ চলছে। প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া সহজ করতে প্রস্তাবে শুধু দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদকের) দায়ের করা পাসপোর্ট জালিয়াতি ও দুর্নীতির ৬টি মামলার নথিপত্র যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের কাছ থেকে সব নথিপত্র পাওয়ার পর বেনজীরকে পাঠানোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন আমিরাতের আদালত। নথিপত্রের জটিলতায় যাতে বেনজীরের দেশে ফেরা আটকে না যায় সে বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।

নথি প্রস্তুত হয়ে গেলে সেগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখায় পাঠানো হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যর্পণ প্রস্তাবে সেগুলো যুক্ত করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটি আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। গতকাল সংশ্লিষ্ট সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাওয়ার পর আমিরাতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রথমে নথিপত্র যাচাই করবে। সে দেশের আদালত দেখবেন, যে অপরাধের অভিযোগে বাংলাদেশ বেনজীর আহমেদকে ফেরত চাইছে, সেই ধরনের অপরাধ আমিরাতের আইনেও অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় কি না। নথিগুলো দেখার পর যদি দুবাই মনে করে- বাংলাদেশে বেনজীরের ন্যায্য বিচার হবে এবং তাকে ফেরত দেওয়া উচিত-তাহলেই বেনজীরকে ফেরানো সম্ভব হবে।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানিয়েছে, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ১৭টি, দুদকে ৬টি ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) ৩টি পরোয়ানা রয়েছে। দুদকের ৬টি মামলার মধ্যে একটিতে পরোয়ানা জারি হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের অভিযোগগুলোর মধ্যে গুম কমিশনের দেওয়া অভিযোগ, শাপলা চত্বরে গণহত্যাসহ সারা দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তবে তাকে দেশে ফেরাতে যে প্রত্যর্পণের প্রস্তাব দুবাইয়ে পাঠানো হবে সেখানে শুধু দুদকের দায়ের করা দুর্নীতি ও জালিয়াতির নথিপত্র পাঠানো হবে। সঙ্গে দুদকের যে মামলায় পরোয়ানা জারি হয়েছে সেটি যুক্ত করা হবে। ইতোমধ্যে পরোয়ানার কপি আরবিতে ট্রান্সলেট করা হয়েছে। মামলার নথিগুলো প্রস্তুত হয়ে গেলে-সেগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রাজনৈতিক অধিশাখায় পাঠানো হবে। রাজনৈতিক অধিশাখা কাগজগুলো যাচাইবাছাই করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। সেখান থেকে দুবাইয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবের চিঠি পাঠানো হবে।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, ৩০ দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ (্এক্সাডেশন) অনুরোধ পাঠাতে হবে। যা দ্রুতই পাঠানো হবে। বাংলাদেশের সঙ্গে প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই বিষয়টি উল্লেখ করলে সচিব বলেন, চুক্তি নেই, তবে আমরা পারস্পরিক আইনি সহায়তার (মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট-এমএলএআর) মাধ্যমে আমরা কার্যক্রম এগিয়ে নেব। এ প্রক্রিয়া দুই দেশের সরকার ও তদন্ত সংস্থা একে অপরের সঙ্গে তথ্য, প্রমাণ এবং পলাতক আসামির প্রত্যর্পণসংক্রান্ত আইনি সহায়তা প্রদান করে থাকে। পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, বেনজীরকে ফেরাতে এখন পুলিশের তেমন কোনো কাজ নেই। এনসিবি শাখা থেকে রেড নোটিস জারি করার পরই আমাদের কাজ শেষ। এখন দুদক নথিপত্র প্রস্তুত করবে। বাকিটা স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেখবে।

বেনজীরের বিরুদ্ধে থাকা পাসপোর্ট জালিয়াতি ও দুর্নীতির মামলাগুলোর তথ্যপ্রমাণসংবলিত নথি চূড়ান্ত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কূটনৈতিক চ্যানেলে পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে দুদক। দুদক সূত্রে জানা গেছে, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, মানি লন্ডারিং, পাসপোর্ট জালিয়াতিসহ মোট ৬টি মামলা রয়েছে। এসব মামলার নথি ও সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত একত্র করে দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে বেনজীর আহমেদকে ফেরানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শিগগিরই আরব আমিরাত সরকারকে অনুরোধ চিঠি পাঠানো হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কূটনৈতিক চ্যানেলে এই চিঠি পাঠানো হবে।