মালয়েশিয়া সফরে আলোর রেখা দেখছে বাংলাদেশের শ্রমবাজার। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে যে জটিলতা ও অনিশ্চয়তা ছিল, তা কেটে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। ২১ জুন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে যাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারপ্রধান হিসেবে এটিই তার প্রথম বিদেশ সফর, যা কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এ উপলক্ষে মালয়েশিয়ায় কর্মরত এবং দেশটিতে যেতে আগ্রহী কয়েক লাখ বাংলাদেশি কর্মীর মধ্যে নতুন আশা সঞ্চারিত হয়েছে।
বিএনপি সরকার গঠনের পর গুরুত্বপূর্ণ জনশক্তির বাজার আবারও উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কুয়ালালামপুর সফরে অভিবাসন-সংক্রান্ত বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে আলোচিত হবে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীও। গত এপ্রিলে মালয়েশিয়া সফর করেন আরিফুল হক চৌধুরী ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। বাংলাদেশি শ্রমিক সরবরাহ বন্ধের সুযোগ নিচ্ছে নেপাল, ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমার। তারা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে নিজেদের কার্যক্রম বাড়ানো অব্যাহত রেখেছে।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, বাংলাদেশের জন্য দুই বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ আছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। বাজারটি নিয়ে দেশের ভেতরে দুটি গ্রুপ পরস্পরকে ঘায়েল করছে। দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা হলেও সে বাজারে সফলতা আসেনি। ১৯৭৬ সালে মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া শুরু করে। ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক গেছে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ। বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে বন্ধ হয়ে যায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। ২০২২ সালের আগস্টে আবারও শ্রমবাজার খুলে দেওয়া হয়। সব এজেন্সির জন্য উন্মুক্ত রাখার আন্দোলন হলেও তা হয়নি শেষ পর্যন্ত। শ্রমিক নিয়োগের জন্য শেষ পর্যন্ত ১০০ এজেন্সির নাম চূড়ান্ত করে সরকার। বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার চতুর্থ জনশক্তি রপ্তানিকারক দেশ। বিভিন্ন সময়ে বন্ধ হওয়ায় সেখানকার বাজার বাংলাদেশের হাতছাড়া হয়ে পড়ে।
সিন্ডিকেট থাকবে না : প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোনো সিন্ডিকেটের সুযোগ থাকবে না। এ বিষয়ে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি। দ্রুত মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলে যাবে। প্রধানমন্ত্রীর সফরে অনেক কিছু পরিষ্কার হবে ইনশা আল্লাহ। রেমিট্যান্সযোদ্ধারা আমাদের প্রাণ।’ তিনি বলেন, ‘বিদেশে লোক পাঠানোর নামে যারা অপকর্ম করছে, তাদের আইনের আওতায় নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতারকচক্র শ্রমিকদের সর্বশান্ত করবে, এটা মেনে নেওয়া যায় না।’
কঠিন চিঠি মালয়েশিয়ার : ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি চিঠি দেয় বাংলাদেশকে। চিঠিতে কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। যেমন এজেন্সির ন্যূনতম ৫ বছরের লাইসেন্স থাকতে হবে, বিগত তিন বছরে কমপক্ষে ৩ হাজার কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, একেকটি এজেন্সির অন্তত তিনটি দেশে শ্রমিক পাঠানোর রেকর্ড থাকতে হবে, অফিসের আকার ও স্থায়িত্ব ১০ হাজার বর্গফুট আয়তনের হতে হবে। ওই অফিস ৫ বছর ধরে কার্যক্রম আছে তার প্রমাণপত্র থাকতে হবে, আন্তর্জাতিক নিয়োগদাতার কমপক্ষে পাঁচটি লিখিত সুপারিশপত্র থাকতে হবে, নিজস্ব প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়নকেন্দ্র থাকতে হবে, আবাসনের সুবিধা থাকতে হবে। সুশৃঙ্খল আচরণের সনদ, বৈধ লাইসেন্স ও আইনি কার্যক্রমের প্রমাণপত্র দাখিল করতে হবে। মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠিয়েছে এ রকম অনেকের নামে মানিলন্ডারিংসহ অন্যান্য মামলা আছে কিনা, তা স্পষ্ট করতে হবে। এসব শর্তে বেকায়দায় পড়ে যায় এজেন্সিগুলো। এ নিয়ে তদবির করে ব্যর্থ হয়েছেন এজেন্সির মালিকরা।
নতুন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক : প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়ার মূল কারণ দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধপরিস্থিতির কারণে সেখানকার শ্রমবাজার কিছুটা সংকুচিত, তাই মালয়েশিয়ার বাজার চালু করার দাবি উঠেছে। সফরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠকে দ্বিপাক্ষীয় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা ও সংস্কৃতির পাশাপাশি অভিবাসন খাত বেশি অগ্রাধিকার পাবে। মালয়েশিয়ায় এখনও ৮ থেকে ১২ লাখ বিদেশি কর্মীর চাহিদা রয়েছে। তবে আগামীতে দেশটি শুধু সাধারণ শ্রমিক নয় বরং দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মী নিতে আগ্রহী; বিশেষ করে ইলেক্ট্রনিক্স, প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি ও সেব খাতের জন্য দক্ষ জনশক্তি চাচ্ছে মালয়েশিয়া। আগামী এক বছরে ওই দেশে দেড় লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে মালয়েশিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশিরা উৎসবের আমেজে রয়েছে। কুয়ালালামপুর, পেনাং, জহুর বারুসহ বিভিন্ন শহরে প্রবাসী সংগঠনের ও কমিউনিটির নেতারা নিয়মিত বৈঠক করছেন।
অনিয়মিতদের বিষয়েও সমাধান চান প্রবাসীরা : মালয়েশিয়াপ্রবাসী ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীদের মতে, মালয়েশিয়ায় যেসব বাংলাদেশি অনিয়মিত বা অবৈধ হয়ে পড়েছেন তাদের বৈধকরণের ব্যাপারেও প্রধানমন্ত্রীর সফরে সমাধান মিলবে। দূতাবাসের কঠোর নজরদারি এবং ভুয়া ডিমান্ড লেটার দেওয়া প্রতারকচক্রের বিরুদ্ধে আইনিব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ প্রবাসীরা। টেলিফোনে কয়েকজন প্রবাসী দেশ রূপান্তরকে বলেন, অতীতে দেখা গেছে চুক্তি হওয়ার পরও দালালের খপ্পরে পড়ে কর্মীরা সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। তাই বাংলাদেশ হাইকমিশনের লেবার উইংকে আরও শক্তিশালী ও দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। নামসর্বস্ব কোম্পানির নামে ভুয়া চাহিদাপত্র তৈরি করে ভিসা বিক্রি বন্ধ করতে হবে। প্রতিটি ডিমান্ড লেটার সঠিকভাবে যাচাই করতে হবে। ২০২৪ সালের মে মাসে যারা ভিসা পেয়েও মালয়েশিয়া যেতে পারেননি, তাদের বিষয়েও প্রধানমন্ত্রী কথা বলবেন বলে তাদের আশা।
দোষারোপের সংস্কৃতি : বায়রার কয়েকজন নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সফরে কঠিন শর্তগুলোর বিষয়ে সমাধান পাওয়া যাবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস। মালয়েশিয়ায় শ্রমিক নিয়োগ বন্ধের কারণগুলো উদঘাটন করতে হবে। এজেন্সির মালিকদের বিরোধিতার, পরস্পরের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো বন্ধ করতে হবে।’ তারা বলেন, ‘রিক্রুটিং এজেন্সির ব্যবসা নিয়ে জট পাকানো হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের স্বার্থকে নয় বরং দুই দেশের সরকারের নিয়মনীতিকে প্রাধন্য দিয়ে শ্রমিকের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে শ্রমবাজার খুলতে হবে। এতে দেশে রেমিট্যান্সপ্রবাহ বাড়বে। ব্যবসায়ীদের একটি অংশ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ও মন্ত্রণালয়কে দুর্বল ভেবে হাঙ্গামা সৃষ্টি করে। এক শ্রেণির রিক্রুটিং ব্যবসায়ী সরকারকে ভুল বুঝিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে মামলা করে। আবার সরকারের বিভিন্ন সংস্থা নানা অভিযোগ তুলে স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলা করছে। এসব শ্রমবাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তারপরও আমরা আশা করছি, প্রধানমন্ত্রীর সফর ইতিবাচক হবে।’
নিয়োগবিষয়ক আলোচনা : প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রবাসীকল্যাণ উপদেষ্টা ও মন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরের পর দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা এসেছে। আগে যে ওয়েবসাইট বা অনলাইন সিস্টেমের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ হতো, তা বহাল থাকবে নাকি নতুন পদ্ধতি চালু হবে, সে বিষয়ে মালয়েশিয়া সরকার কাজ করছে। পরে মালয়েশিয়ার মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। পুরনো ১০০টি এজেন্সির যে তালিকা ছিল, তা দিয়েই নতুন কর্মী যাবে নাকি বাছাই করা এজেন্সির মাধ্যমে যাবে তা নিয়ে আলোচনা চলছে। বিদ্যমান এমওইউ সংশোধিত না হলে সিন্ডিকেটের সুবিধাভোগীরা আবারও সুযোগ পাবে বলে আশঙ্কা। এরই মধ্যে ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা মালয়েশিয়া সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে।
প্রথম মালয়েশিয়ায় যান মাত্র ২৩ শ্রমিক : ১৯৭৮ সালে প্রথম ২৩ জন শ্রমিক মালয়েশিয়ায় যান। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে আনুষ্ঠানিক জনশক্তি নিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ১৯৯২ সালে। ১৯৯০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সে দেশে বাংলাদেশি শ্রমিক রপ্তানি বৃদ্ধি পায়। ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৫১ হাজার ৬৮৩ জন মালয়েশিয়ায় যান।
মানবপাচার চলছেই : নজরদারির মধ্যেও থেমে নেই বিদেশে মানবপাচার। ট্রাভেল এজেন্টরা মানবপাচারে বেশি জড়িত। লিবিয়া, ইতালি, ফ্রান্সসহ ইউরোপে চাকরি দেওয়ার কথা বলে লোকজনকে নেওয়া হচ্ছে। পাচারের কথিত রাজনীতিক, বেবিচক, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, বিভিন্ন এয়ারলাইন্স ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, ট্রাভেল এজেন্সির লোকজন জড়িত। সম্প্রতি পুলিশের একটি সেমিনারে বলা হয়েছে, ‘২০১০ সালে আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা জাতীয় দাসত্ব ও মানবপাচার প্রতিরোধে জানুয়ারি মাসকে ন্যাশনাল সেøøভারি অ্যান্ড হিউম্যান ট্রাফিকিং প্রিভেনশন মান্থ ঘোষণা করেছিলেন। প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় আড়াই কোটি নারী, পুরুষ ও শিশু পাচারের শিকার হচ্ছে। তাদের যৌনকর্মে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে বলপূর্বক কেনা-বেচা করা হচ্ছে। আর পাচারকারীরা হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।’
কম খরচে মালয়েশিয়ায় নেওয়ার প্রলোভন : বায়রার সাবেক মহাসচিব মুক্তিযোদ্ধা আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, কর্মীদের নিরাপদ কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তা এবং কম খরচে মালয়েশিয়ায় নেওয়ার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। দেশের স্বার্থ ও শ্রমিকের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। বায়রার কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক অর্থ ও মানবপাচারের মামলার প্রত্যাহার বা নিষ্পত্তি দরকার।’