চ্যালেঞ্জপূর্ণ বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও ২০২৫ সালে শক্তিশালী আর্থিক প্রবৃদ্ধি, সদৃঢ় সম্পদমান, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণ এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক পূবালী ব্যাংক পিএলসি। সম্প্রতি ব্যাংকের ৪৩তম বার্ষিক সাধারণ সভায় ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ আলী ২০২৫ সালের কার্যক্রম, আর্থিক ফল এবং ভবিষ্যৎ কৌশল তুলে ধরেন।
বক্তব্যের শুরুতে তিনি বলেন, গত তিন বছরে পূবালী ব্যাংক শুধু ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধিই অর্জন করেনি, বরং শেয়ারহোল্ডারদের জন্যও উল্লেখযোগ্য মূল্য সৃষ্টি করেছে। ২০২২ সালে যেখানে ব্যাংকের শেয়ারদর ১৬ থেকে ২০ টাকার মধ্যে অবস্থান করছিল, বর্তমানে তা ৩৭ টাকারও ঊর্ধ্বে উন্নীত হয়েছে। একই সঙ্গে ধারাবাহিক স্টক ডিভিডেন্ডের মাধ্যমে ব্যাংকের পেইড আপ ক্যাপিটাল প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা থেকে প্রায় ৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ৫৬০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে, যা শেয়ারহোল্ডারদের অংশীদারত্বের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাংকের মূলধনী ভিত্তিকেও আরও শক্তিশালী করেছে। ফলে ২০২২ সালের তুলনায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের বাজারমূল্য তিনগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, সুশাসন, গ্রাহকের আস্থা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির প্রতিফলন।
তিনি এ সাফল্যের জন্য ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার, গ্রাহক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যবসায়িক অংশীদার, গণমাধ্যম এবং পরিচালনা পর্ষদের দূরদর্শী দিকনির্দেশনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও পূবালী ব্যাংক সুশাসন, বিচক্ষণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহককেন্দ্রিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য মূল্য সৃষ্টি করে যাচ্ছে।
ডিজিটাল রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা পিআই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ২০২৫ সালের শেষে ৫ লাখ ২৮ হাজার ২৭৬ জন সক্রিয় ব্যবহারকারী অর্জন করেছে। প্ল্যাটফর্মটির মাধ্যমে মোট ১ দশমিক ৮৬ কোটি লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে। বছরওয়ারি হিসাবে ব্যবহারকারী বৃদ্ধি পেয়েছে ৭৮ শতাংশ এবং লেনদেন বৃদ্ধি পেয়েছে ১১৫ শতাংশ, যা ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে গ্রাহকদের ক্রমবর্ধমান আস্থার প্রতিফলন।
ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো সম্প্রসারণেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে ব্যাংকটি। ২০২৫ সালে পিওএস টার্মিনাল সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৫২৫-এ এবং ১ দশমিক ৪৫ লাখেরও বেশি বাংলা কিউআর স্থাপনের মাধ্যমে নগদহীন লেনদেনকে আরও সহজ, নিরাপদ ও বিস্তৃত করা হয়েছে। এর ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, খুচরা বিক্রেতা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ডিজিটাল আর্থিক সেবার প্রসার বৃদ্ধি পেয়েছে।
পূবালী ব্যাংকের বিস্তৃত নেটওয়ার্কও এই রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকের ৫১৭টি শাখা, ২৭৪টি উপ-শাখা, ২২টি ইসলামিক ব্যাংকিং উইন্ডো এবং ৯০১টি এটিএম/সিআরএম কার্যকর ছিল। সেলফ সার্ভিস ব্যাংকিং ও ডিজিটাল অনবোর্ডিং সুবিধা গ্রাহকদের জন্য ব্যাংকিংকে আরও দ্রুত, সহজ ও স্বনির্ভর করেছে।
আর্থিক সূচকেও ব্যাংকটি শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকের মোট সম্পদ ২০ দশমিক ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার ১৩ দশমিক ৬৬ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। আমানত দাঁড়িয়েছে ৮৯ হাজার ৫১৯ দশমিক ৪৯ কোটি টাকা এবং ঋণ ও অগ্রিম বেড়ে হয়েছে ৭১ হাজার ১৪০ দশমিক ৬৩ কোটি টাকা। একই সময়ে একীভূত পরিচালন মুনাফা ২ হাজার ৯০৭ দশমিক ৫৭ কোটি টাকা এবং কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ১ হাজার ৭৯ দশমিক ৫৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
শেয়ারহোল্ডার ভ্যালুর ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকের ইপিএস দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩০, আরওই ১৫ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং আরওএ ১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। পাশাপাশি ক্যাপিটাল টু রিস্ক-ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও (সিআরএআর) ১৫ দশমিক ৩৪ শতাংশে অবস্থান করেছে, যা নিয়ন্ত্রক ন্যূনতম সীমার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি এবং ব্যাংকের মূলধনী শক্তি ও স্থিতিশীলতার পরিচায়ক।
অ্যাসেট কোয়ালিটির ক্ষেত্রেও পূবালী ব্যাংক শিল্প খাতের তুলনায় ব্যতিক্রমী অবস্থান ধরে রেখেছে। ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকের এনপিএল অনুপাত ছিল মাত্র ২ দশমিক ২০ শতাংশ, যেখানে খাতভিত্তিক গড় এনপিএল প্রায় ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে। ডেটা-নির্ভর মনিটরিং, বিচক্ষণ ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং শক্তিশালী পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের মাধ্যমে এই সাফল্য অর্জিত হয়েছে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও রেমিট্যান্স প্রবাহেও পূবালী ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত রপ্তানি ব্যবসা ৩৮ হাজার ৬৬৪ দশমিক ২৬ কোটি টাকা, আমদানি ব্যবসা ৪৭ দশমিক ৩১৩ দশমিক ৭৪ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক রেমিট্যান্স ১১ হাজার ৩৬২ দশমিক ১৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বিশেষ করে রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি ব্যাংকের সেবার মান, বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এবং গ্রাহক আস্থার প্রতিফলন।
প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি ইএসজি ও টেকসই উন্নয়নেও গুরুত্ব দিচ্ছে পূবালী ব্যাংক। ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকের মোট ঋণ ও অগ্রিমের প্রায় ৩০ শতাংশ টেকসই অর্থায়ন পোর্টফোলিও-এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ ছাড়া ৪১১টি শাখা এবং ৪৫৩টি এটিএম/সিআরএম-এ সৌরশক্তির ব্যবহার, ৩৭টি লিড সার্টিফিকেশন ফ্যাক্টর-তে অর্থায়ন, আইএফআরএস এস১ ও এস২ এডপশন এবং নেট-জিরো ২০৫০ লক্ষ্যকে সামনে রেখে ডিকার্বনাইজেশন পলিসি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যাংকটি দায়িত্বশীল ব্যাংকিংয়ের দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে মোহাম্মদ আলী বলেন, ২০২৬-২০২৮ কৌশলগত পরিকল্পনার আওতায় পূবালী ব্যাংক প্রযুক্তিনির্ভর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই ব্যাংকিং মডেল বাস্তবায়নে কাজ করছে। ২০২৬ সালে ব্যাংকটি একটি ইয়ার-লং ক্যাশলেস ব্যাংকিং ক্যাম্পেইন পরিচালনা করবে, যার মাধ্যমে রিটেইল, হেল্থ, এডুকেশন, করপোরেট, এবং সিএমএসএমই খাতে ডিজিটাল লেনদেন আরও সম্প্রসারিত হবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের বিপুল জনগোষ্ঠী এখনো পূর্ণাঙ্গ আর্থিক সেবার বাইরে রয়েছে। ব্রাঞ্চ নেটওয়ার্ক, সাব-ব্রাঞ্চ, সেল্ফ-সার্ভিস পয়েন্ট, পিআই অ্যাফ এবং বাংলা কিউআর-এর সমন্বয়ের মাধ্যমে ‘ব্যাংকিং দ্য আনব্যাংক’ লক্ষ্য বাস্তবায়ন করে দেশের আরও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসতে চায় পূবালী ব্যাংক।