বাজেটে জ্বালানি বরাদ্দের ৯৮ ভাগ জীবাশ্মে দুই ভাগ নবায়নযোগ্যে

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে বরাদ্দের মাত্র ২ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য রাখা হয়েছে। বাকি ৯৮ শতাংশই জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। গতকাল বুধবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে আয়োজিত ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট : বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত কী পেল?’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়। সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট হেলেন মাশিয়াত প্রিয়তী। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন, সংস্থার গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ, ডেমোক্রেটিক বাজেট মুভমেন্টের জেনারেল সেক্রেটারি মনোয়ার মোস্তফা, ইডকলের চিফ রিস্ক অফিসার মোহাম্মদ জাবেদ ইমরান।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বাইরে থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে উৎসাহিত করার উদ্যোগ দেখা গেলেও নীতিগতভাবে এখনও জীবাশ্ম জ্বালানির প্রতিই ঝোক রয়ে গেছে। প্রস্তাবিত বাজেট রাজস্ব কাঠামোর বৈষম্য দূর করতে পারেনি। কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন থাকলেও জীবাশ্ম জ্বালানি, এলএনজি, কয়লা ও তেল খাতে দেওয়া বিশেষ সুবিধা কমিয়ে আনার প্রয়োজন রয়েছে।

সবুজ রাজস্ব নীতি নিয়ে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ইউরোপের দেশগুলো দ্রুত পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এ ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো জীবাশ্ম জ্বালানির শুল্ক ও কর কাঠামোর ওপর থাকা সব ধরনের ভর্তুকি তুলে নেওয়া। একই সঙ্গে সবুজ কর ও সবুজ বাজেট কাঠামো নিশ্চিত করা।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ এখনো আধুনিক বাজেট কাঠামো থেকে অনেক দূরে রয়েছে। যদিও দেশের অর্থনীতি বর্তমানে তীব্র জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত আমদানির কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো ধীরে ধীরে সবুজ রাজস্ব কাঠামোর দিকে অগ্রসর হওয়া।

মূল প্রবন্ধে বলা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ২ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। তবে জাতীয় বাজেটে এ খাতের অংশীদারিত্ব ২ দশমিক ১৫ শতাংশ থেকে কমে ১ দশমিক ৮৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ বিভাগের বরাদ্দ ৩ দশমিক ৯ শতাংশ কমে ১৪ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বিপরীতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের বরাদ্দ প্রায় ৭২ শতাংশ বেড়েছে, যার প্রধান কারণ গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন প্রকল্পে অধিক গুরুত্ব দেওয়া।

সিপিডি বলছে, প্রস্তাবিত বাজেটে প্রথমবারের মতো সৌরবিদ্যুৎ খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এ খাতের জন্য ২০৩৫ সাল পর্যন্ত শূন্য শতাংশ করহার বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের বিপরীতে ৫ শতাংশ কর রেয়াত দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে ব্যবহৃত অ্যালুমিনিয়াম ও ইস্পাত কাঠামো, বিভিন্ন ধরনের বৈদ্যুতিক পরিবাহী, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি, সৌর বৈদ্যুতিক রূপান্তরক এবং সৌর প্যানেলের ওপর বিদ্যমান করভার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং কেন্দ্রের ওপর কর প্রত্যাহার এবং নিবন্ধন ফি কমানোর উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে সংস্থাটি।

তবে একই সঙ্গে বাজেটে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে মূল্য সংযোজন কর অব্যাহতি বহাল রাখা হয়েছে, যা একে সবচেয়ে কম করযুক্ত জ্বালানি হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে বলে উল্লেখ করেছে সিপিডি। পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লা আমদানিতে শুল্ক সুবিধার মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে এবং আগামী অর্থবছরে ৬ লাখ মেট্রিক টন কয়লা উত্তোলনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এসব পদক্ষেপের সমালোচনা করে সিপিডি বলেছে, একদিকে উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানি নিরুৎসাহিত করার কথা বলা হলেও অন্যদিকে এ জ্বালানিকে ধারাবাহিকভাবে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। নতুন করে কয়লা অনুসন্ধান ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে শুল্ক সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত জ্বালানি রূপান্তরের লক্ষ্য ও অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে আগামী জাতীয় বাজেটে সুনির্দিষ্ট সবুজ রাজস্ব নীতি ঘোষণার পাশাপাশি এই নীতির আলোকে দেশের সামগ্রিক রাজস্ব কাঠামো পুনর্গঠন করার আহ্বান জানায় সিপিডি।