মাহ্দী আমিন

প্রাথমিক গোল্ড কাপ ফুটবলে ২২ লাখ শিক্ষার্থী, লক্ষ্য ৫০ লাখ

দেশের প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতা বিকাশে ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। চলতি বছর প্রাথমিক গোল্ড কাপ ফুটবল প্রতিযোগিতায় ২২ লাখ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন। আগামীতে এ সংখ্যা ৫০ লাখে উন্নীত করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

প্রাথমিক গোল্ড কাপ ফুটবলের ফাইনাল উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

মাহ্দী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণের পর গত চার মাসে বিভিন্ন খাতে উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রতিটি মন্ত্রণালয় সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ও প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা-ভিশন বাস্তবায়নে সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে সমতা, ন্যায়বিচার এবং শহর-গ্রামের শিক্ষাগত বৈষম্য কমে আসবে। প্রধানমন্ত্রী সার্টিফিকেটনির্ভর শিক্ষা নয়, বরং এমন শিক্ষা ব্যবস্থা চান যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে নাগরিক মূল্যবোধ, সামাজিকতা, নৈতিকতা ও পারিবারিক শিক্ষা গড়ে তুলবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে শৃঙ্খলা, সততা, মূল্যবোধ ও নেতৃত্বের গুণাবলি বিকশিত হবে।

এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে গার্লস গাইড, বিএনসিসি ও রোভার স্কাউট কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

মাহ্দী আমিন বলেন, সরকার দেশব্যাপী খেলাধুলা, সংস্কৃতি, বিতর্ক, বিজ্ঞান উৎসব, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও উদ্ভাবনী চিন্তাধারাভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতা আয়োজন করছে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও মেধার বিকাশ ঘটানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ‘নতুন কুঁড়ি’ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে, যা খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করবে। শিগগিরই কোরআন তেলাওয়াতভিত্তিক কর্মসূচিও চালু করা হবে।

তিনি বলেন, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণি থেকে দুটি নতুন বিষয় ‘স্পোর্টস’ ও ‘কালচার’ পাঠ্যক্রমে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়ার সমন্বয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দলগত দক্ষতা, শৃঙ্খলা, আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগ এবং অন্যান্য স্থানান্তরযোগ্য দক্ষতা গড়ে তোলা হবে।

এছাড়া ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে আরও দুটি নতুন বিষয় চালুর পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। এর মধ্যে একটি ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’, যার মাধ্যমে আনন্দময় ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিক্ষা নিশ্চিত করা হবে। অন্যটি ‘টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভোকেশনাল এডুকেশন’। বর্তমানে এ ধরনের শিক্ষা সীমিত আকারে থাকলেও আগামীতে তা সকল শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রাথমিকভাবে তাত্ত্বিক শিক্ষা এবং অষ্টম শ্রেণি থেকে ধাপে ধাপে ল্যাব স্থাপনের মাধ্যমে ব্যবহারিক কারিগরি শিক্ষা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রাথমিক গোল্ড কাপ ফুটবল সম্পর্কে মাহ্দী আমিন বলেন, চলতি বছরের ৬ এপ্রিল শুরু হওয়া এ প্রতিযোগিতায় দেশের ৬৫ হাজার ৩৪২টি বিদ্যালয় থেকে ১১ লাখের বেশি ছাত্র এবং ১১ লাখের বেশি ছাত্রী অংশ নিয়েছে। প্রায় আড়াই মাসব্যাপী এ প্রতিযোগিতা ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় অতিক্রম করে জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে।

তিনি জানান, আগামী ২০ জুন জাতীয় আর্মি স্টেডিয়ামে প্রতিযোগিতার ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধানমন্ত্রী প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।

সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শিশুদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণকে আরও উৎসাহিত করতে গণমাধ্যমকে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে তাদের সাফল্য তুলে ধরলে অন্য শিক্ষার্থীরাও উদ্বুদ্ধ হবে। প্রথম বছরেই ২২ লাখ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে। ভবিষ্যতে এ সংখ্যা অন্তত ৫০ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।

বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনভিত্তিক প্রতিযোগিতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য স্টার্টআপ, বিজ্ঞান, প্রকল্প ও উদ্ভাবনী ধারণা প্রদর্শনের একটি জাতীয় প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়েছে। এতে ১২ হাজার দল অংশ নিয়েছে। প্রতিটি দলে তিনজন শিক্ষার্থী থাকায় মোট ৩৬ হাজার শিক্ষার্থী এবং দুইজন শিক্ষক হিসেবে প্রায় ২৪ হাজার শিক্ষক এ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হয়েছেন।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তামূলক চিন্তা, বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন ও সৃজনশীল ধারণাগুলোকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে এবং সম্ভাবনাময় প্রকল্পগুলোকে বাণিজ্যিকীকরণ, অর্থায়ন ও পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এ প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব আগামী ২৯ জুন বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রী সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। ১০০টি দল চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেবে এবং বিজয়ীদের পুরস্কৃত করা হবে।

একই দিনে দেশব্যাপী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে বলেও জানান তিনি। এ কর্মসূচির আওতায় দেশের ২৯ হাজার ৬৩১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একযোগে অংশ নেবে। প্রধানমন্ত্রী সরাসরি বৃক্ষরোপণ করবেন এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ভার্চুয়ালি যুক্ত থাকবে।

মাহ্দী আমিন বলেন, সরকারের লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইভিত্তিক শিক্ষায় সীমাবদ্ধ না রেখে সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা। নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে বৃক্ষরোপণ, খাল খনন, গণশিক্ষা কার্যক্রমসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো হবে।

তিনি বলেন, আগামীর বাংলাদেশ গড়বে আজকের শিক্ষার্থীরা। তাই তাদের মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিক চরিত্র, পারিবারিক শিক্ষা ও নাগরিক দায়িত্ববোধে সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। এ লক্ষে পাঠ্যক্রমে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও সংস্কার আনা হচ্ছে এবং সহশিক্ষা কার্যক্রম, খেলাধুলা ও সংস্কৃতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনের শেষে তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান, বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের সাফল্য তুলে ধরার মাধ্যমে তাদের আরও উৎসাহিত করতে এবং দেশের প্রতিটি পরিবারে শিক্ষা, ক্রীড়া ও সংস্কৃতিভিত্তিক ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা পৌঁছে দিতে।