নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের শেকড় থেকে উঠে আসা একটি পরিবারের প্রায় ৪৩ সদস্য বর্তমানে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহরে বসবাস করছেন। কেউ চাকরি করছেন, কেউ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, আবার কেউ উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন। তবে বিদেশে দীর্ঘদিন বসবাস করলেও দেশের সংস্কৃতি, ভাষা ও পারিবারিক বন্ধন ধরে রেখেছেন তারা।
পরিবারটির যাত্রার শুরু গোলাম রহমানকে ঘিরে। জীবিকার সন্ধানে তিনি ১৯৫৫ সালে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। সে সময় সেখানে বাংলাদেশি বা বাঙালি কমিউনিটির উপস্থিতি ছিল খুবই সীমিত। নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তিনি নতুন জীবনের ভিত্তি গড়ে তোলেন এবং ১৯৫৯ সালে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব অর্জন করেন। পরবর্তীতে তার সেই পথ ধরেই পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও যুক্তরাজ্যে যাওয়ার সুযোগ পান।
দেশে ফিরে গোলাম রহমান ১৯৬৯ সালে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সিরাজপুর ইউনিয়নের বিরাহীমপুর গ্রামে নতুন বসতি স্থাপন করেন।
তিন ছেলে ও চার মেয়ের জনক গোলাম রহমান ছিলেন সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়। স্থানীয় শিক্ষার প্রসারে বিরাহীমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য জমি দান করেন। এছাড়া কমিউনিটি ক্লিনিক ও রহমানিয়া জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠার জন্যও জমি দেন। ২০১১ সালের ১ নভেম্বর নিজ গ্রামের বাড়িতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০০৪ সালে তার দুই ছেলে গোলাম মাহমুদ ও আব্দুল কুদ্দুছ সুমন যুক্তরাজ্যে গিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর ২০০৬ সালে চার মেয়ে—আশ্রাফের নেছা রুবি, শামসুর নাহার মিনা, নূর নাহার রিনা ও নূরজাহান রুনাও সেখানে পাড়ি জমান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সন্তান-সন্ততি ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা যুক্ত হয়ে বর্তমানে পরিবারটির ৪৩ সদস্য যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। তাদের সঙ্গে রয়েছেন পরিবারের প্রবীণ সদস্য মমতাজ বেগমও।
বর্তমানে পরিবারটির অধিকাংশ সদস্য ব্রিটিশ নাগরিকত্ব লাভ করেছেন। নতুন প্রজন্মের অনেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। কেউ ব্যবসা পরিচালনা করছেন, কেউ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। পরিবারের কয়েকজন সদস্যের বিয়ে হয়েছে যুক্তরাজ্যেই, আর নতুন প্রজন্মের অনেকের জন্মও সেখানে।
তবে প্রজন্ম বদলালেও পরিবারটির মধ্যে এখনো দৃঢ়ভাবে টিকে আছে বাংলা সংস্কৃতি ও পারিবারিক ঐতিহ্য। লন্ডনের বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করলেও ঈদ, বিয়ে কিংবা অন্যান্য পারিবারিক অনুষ্ঠানে সবাই একত্রিত হন। এসব আয়োজনে থাকে দেশীয় খাবারের আয়োজন, বাংলা ভাষায় আড্ডা এবং শেকড়ের স্মৃতিচারণ।
পরিবারের সদস্য আশ্রাফের নেছা রুবির ভাষ্য, তাদের বাবা সবসময় পরিবারের সবাইকে একসূত্রে গাঁথা দেখতে চাইতেন। বিদেশে থেকেও সেই বন্ধন অটুট রাখার চেষ্টা করছেন তারা। তার মতে, পারিবারিক ঐক্যই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
নূরজাহান রুনা বলেন, নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে তারা বিশেষ গুরুত্ব দেন। বিদেশে বেড়ে উঠলেও সন্তানরা যেন নিজেদের শেকড় ও পরিচয় ভুলে না যায়, সে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
পরিবারটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠদের মতে, যুক্তরাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হলেও তারা নিয়মিত দেশে আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর নেন এবং বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করেন। প্রবাস জীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও দেশের প্রতি ভালোবাসা, গ্রামের স্মৃতি এবং পারিবারিক বন্ধন ধরে রেখে গোলাম রহমানের পরিবার হয়ে উঠেছে প্রবাসে বাঙালি ঐতিহ্য রক্ষার একটি অনন্য উদাহরণ।