ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতায় তেহরানের অর্থনৈতিক জয়

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে হওয়া প্রাথমিক সমঝোতা ইরানকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা দিয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশের সবচেয়ে জটিল মতবিরোধের ক্ষেত্রগুলো ও পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে ইরানকে শেষ পর্যন্ত যে কঠিন ছাড়গুলো দিতে হতো তা আপাতত ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। এটিও ইরানের জন্য অনেকটাই ইতিবাচক।

সমঝোতা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ-অবরোধ তুলে নেবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চূড়ান্ত পারমাণবিক চুক্তি হওয়ার আগেই ইরানকে আবার তেল রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হবে। এতে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটে থাকা দেশটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক লাইফলাইন পাবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের মুদ্রার ব্যাপক অবমূল্যায়ন এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দেশটির অর্থনীতি তীব্র চাপের মুখে ছিল।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের প্রধান অঙ্গীকার হলো আগামী ৬০ দিনের জন্য হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখা। তবে ওই সময়সীমা শেষে জাহাজ চলাচলে ফি আরোপের সুযোগ সমঝোতায় খোলা রাখা হয়েছে।

ফ্রান্সের সায়েন্সেস পো'র সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক নিকোল গ্রায়েভস্কি বলেন, ‘সবদিক বিবেচনায় সমঝোতাটি ইরানের অনুকূলেই বলে মনে হচ্ছে। তুলনামূলকভাবে সীমিত নতুন পারমাণবিক প্রতিশ্রুতি দেওয়ার বিপরীতে তেহরান নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পথে অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশেষত তেল রপ্তানি পুনরুদ্ধারের সুযোগ, অর্থনৈতিক সুবিধা এবং সামরিক চাপ হ্রাস পেয়েছে।

গ্রায়েভস্কির মতে, যুক্তরাষ্ট্র যেসব কঠিন ছাড় আদায় করতে চেয়েছিল, সেগুলোর বেশিরভাগই ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে। যদিও পরবর্তী চুক্তিতে দুই পক্ষের লাভ-ক্ষতির ভারসাম্য বদলাতে পারে, তবে বর্তমান সমঝোতায় তাৎক্ষণিক ও বাস্তব সুবিধা তুলনামূলকভাবে বেশি পেয়েছে ইরান।

সমঝোতায় যুক্তরাষ্ট্রকে অবিলম্বে নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরানকে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। তবে বাস্তবে এসব পদক্ষেপ ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তা সত্ত্বেও চুক্তির খবরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের গড় দামও কয়েক মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো প্রতি গ্যালন ৪ ডলারের নিচে নেমে এসেছে।

তবে ইরানবিরোধী বিশ্লেষকদের একাংশ এই সমঝোতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সাবেক মার্কিন ট্রেজারি কর্মকর্তা এবং ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজ-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো মিয়াদ মালেকি বলেন, ইরানের তেল বাণিজ্য সহজ করতে ব্যাংকিং নিষেধাজ্ঞা সাময়িক শিথিলের অঙ্গীকার যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্রকে দুর্বল করে দিতে পারে।

অন্যদিকে যারা প্রকাশ্য সংঘাত বা নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে ইরানের সঙ্গে কূটনীতিকে সমর্থন করেন, তারা এই সমঝোতা স্মারকের প্রশংসা করে বলেছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সুযোগ করে দিয়েছে।

ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিল-এর সভাপতি জামাল আবদি বলেন, এগুলো কোনো ছাড় নয়; বরং দীর্ঘদিনের ব্যর্থ চাপ প্রয়োগের নীতির সংশোধন, যা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধকে অনিবার্য করে তুলেছিল।

কিছু বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলেছেন, এমন একটি সমঝোতা যদি শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয়, তবে কয়েক মাসের যুদ্ধের আগেই কেন তা করা গেল না। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো হলি ড্যাগ্রেস বলেন, তিন মাসের যুদ্ধ ছাড়াই এই আলোচনা হতে পারত। হরমুজ প্রণালির মতো বিষয়, যা ঐতিহাসিকভাবেই খোলা ছিল, কূটনীতির মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব ছিল।

তিনি আরও বলেন, সমঝোতায় সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলো—বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সুনির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ—ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমি সন্দিহান যে আগামী ৬০ দিনের আলোচনা কোনো বাস্তব ফল দেবে। এটা কেবল সমস্যাকে ভবিষ্যতের জন্য ঠেলে দেওয়া।’