মানুষের জীবনের অধিকাংশ ব্যস্ততা দুনিয়াকে ঘিরে। ধন-সম্পদ, পদ-মর্যাদা, বাড়ি-গাড়ি, ক্ষমতা ও প্রভাব অর্জনের জন্য মানুষ নিরন্তর ছুটে চলেছে। অনেক সময় এই দুনিয়াকেই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য মনে করা হয়। অথচ ইসলাম মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়, দুনিয়া কখনোই স্থায়ী আবাস নয়, বরং এটি একটি ক্ষণস্থায়ী পরীক্ষাকেন্দ্র। যে দুনিয়ার জন্য মানুষ এত প্রতিযোগিতা করে, সেই দুনিয়ার প্রকৃত মূল্য আল্লাহর কাছে কতটুকু, তা জানলে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে যেতে পারে।
রাসুল (সা.) দুনিয়ার প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী ভাষায় উম্মতকে শিক্ষা দিয়েছেন। সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) সাল্লাম বলেছেন, ‘মহান আল্লাহর নিকট যদি এই পৃথিবীর মূল্য মশার একটি পাখার সমানও হতো, তাহলে তিনি কোনো কাফেরকে এখানকার পানির এক ঢোকও পান করাতেন না।’ (জামে তিরমিজি ২৩২০) এই হাদিসে দুনিয়ার মূল্যহীনতা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। পৃথিবী মানুষের চোখে যত বড় ও আকর্ষণীয়ই হোক না কেন, আল্লাহর কাছে এর মূল্য এতটাই সামান্য যে, তিনি এটিকে তার প্রিয় বান্দা ও অবাধ্য বান্দা উভয়ের জন্য উন্মুক্ত করে রেখেছেন। কাফের, মুশরিক, জালেম ও পাপাচারীরাও দুনিয়ার নানা নেয়ামত ভোগ করছে। যদি দুনিয়া আল্লাহর কাছে প্রকৃত মর্যাদার বস্তু হতো, তাহলে তার অবাধ্য বান্দারা এর কোনো অংশই পেত না।
অন্য একটি হাদিসে রাসুল (সা.) আরও জীবন্ত উদাহরণের মাধ্যমে দুনিয়ার তুচ্ছতা তুলে ধরেছেন। একদিন তিনি একটি মৃত ছাগলের বাচ্চার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যার কান ছিল কাটা বা ছোট। তিনি সেটির কান ধরে সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাদের কেউ কি এক দিরহামের বিনিময়ে এটি নিতে চাও?’ সাহাবিরা বললেন, ‘আমরা তো এটি কোনো কিছুর বিনিময়েও নিতে চাই না।’ তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘আল্লাহর কসম! আল্লাহর কাছে দুনিয়া এর চেয়েও বেশি তুচ্ছ, যেমন তোমাদের কাছে এই মৃত প্রাণীটি তুচ্ছ।’ (সহিহ মুসলিম ২৯৮৫)
ভাবতে অবাক লাগে, যে দুনিয়ার জন্য মানুষ আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করে, অন্যের হক নষ্ট করে, অন্যায়-অবিচারে জড়িয়ে পড়ে, সেই দুনিয়াকে রাসুল (সা.) একটি মৃত ও বিকৃত প্রাণীর চেয়েও তুচ্ছ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এর অর্থ এই নয় যে, ইসলাম দুনিয়া অর্জন করতে নিষেধ করেছে। বরং ইসলাম দুনিয়াকে আখেরাতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতে শিক্ষা দেয়। সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয়, যখন দুনিয়া মানুষের হৃদয়ে এমনভাবে স্থান করে নেয় যে, আখেরাতের কথা ভুলে যায়।
লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ইসলামি গবেষক