হিজরতের ঘটনায় দ্বীন দুনিয়ার কল্যাণ

মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনাদর্শকে অনুসরণ করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অপরিহার্য। যেন দুনিয়ার জীবন সুন্দর এবং পরকালের জীবন সুখময় হয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস, তবে আমার অনুসরণ করো। আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহ ক্ষমা করবেন।’ (সুরা আলে ইমরান ৩১)

নবীজির সুবাসিত জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো হিজরতের ঘটনা। এতে রয়েছে কষ্ট, ত্যাগ ও পরীক্ষা। মুসলিম উম্মাহের উচিত এই ঘটনাকে নিজেদের জীবনের আলোকবর্তিকা হিসেবে গ্রহণ করা। এর মাধ্যমে প্রতিপালকের বাণী বাস্তবায়ন হবে, তার রহস্য উপলব্ধি হবে এবং তার নির্দেশনা অনুধাবন করা যাবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি আপনার প্রতি উপদেশগ্রন্থ অবতীর্ণ করেছি, যাতে আপনি মানুষের কাছে তাদের জন্য যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা স্পষ্ট করে দেন এবং যেন তারা চিন্তা-ভাবনা করে।’ (সুরা নাহল ৪৪)

মুসলিম উম্মাহ কখনোই তাদের সংকট, দুর্দশা ও বেদনাদায়ক ক্ষত থেকে মুক্তির সঠিক পথ খুঁজে পাবে না, যতক্ষণ না তারা তাদের প্রতিপালকের ওহি এবং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহকে গভীর উপলব্ধি, সঠিক বিশ্লেষণ ও বিশুদ্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে অধ্যয়ন করে। হিজরতের মহিমান্বিত ঘটনাটি এমন বহু শিক্ষা ও আলোকিত দৃষ্টান্ত ধারণ করে, যার মধ্যে দ্বীন ও দুনিয়ার কল্যাণ অর্জন এবং অকল্যাণ প্রতিরোধের নির্দেশনা নিহিত রয়েছে। তবে সংক্ষিপ্ত পরিসরে এসব শিক্ষা সম্পূর্ণভাবে আলোচনা করা সম্ভব নয়। তাই এই মহান ঘটনা এবং মানবজাতির জন্য মহান নেয়ামতের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে আলোচনা করব।

প্রথম বিষয় হলো, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেরই মৌলিক ও গৌণ উদ্দেশ্য ছিল। তার জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ছিল মহান আল্লাহর রবুবিয়্যাত (প্রভুত্ব), উলুহিয়্যাত (উপাসনা) এবং নাম ও গুণাবলিতে তার একত্ব প্রতিষ্ঠা করা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের কোনো সময়ই, এমনকি হিজরতের সময়ও তাওহিদের ঘোষণা, তার প্রমাণ উপস্থাপন এবং শিরকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম থেকে শূন্য ছিল না।

হিজরতের সময় শত্রুর কঠোর অনুসরণ ও প্রাণসংকটের মধ্যেও তিনি তাওহিদের আলোচনা বন্ধ করেননি। তিনি যখন মদিনায় ছিলেন, তখনও এ বিষয়ে নীরব থাকেননি। মক্কা বিজয়ের পর বিজয়ীর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েও তিনি তাওহিদের দাওয়াত অব্যাহত রেখেছিলেন। তাই প্রত্যেক যুগে, প্রত্যেক দেশে তাওহিদই হওয়া উচিত মুসলিমদের প্রথম ও শেষ অগ্রাধিকার।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু বিশ^জগতের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য। তার কোনো শরিক নেই। আমাকে এ নির্দেশই দেওয়া হয়েছে এবং আমিই প্রথম আত্মসমর্পণকারী।’ (সুরা আনআম ১৬২-১৬৩)

হে আল্লাহর বান্দারা! মহান আল্লাহর জন্য পূর্ণ সম্মান ও পরিপূর্ণ মহিমা নির্ধারণ করুন। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও সামনে নত হওয়া, আত্মসমর্পণ করা বা উপাসনার কোনো রূপ নিবেদন করা থেকে দূরে থাকুন। এমন সব চিন্তা থেকেও বিরত থাকুন, যা প্রভুর প্রতি বান্দার দাসত্বের সম্পর্ককে ক্ষুণœ করে। সব সৃষ্টির সঙ্গে উপাসনাসংক্রান্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে একমাত্র মহান স্রষ্টার সঙ্গে পূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করুন, যার হাতেই ক্ষতি ও উপকার নিহিত।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে শিরক করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেবেন এবং তার আবাস হবে জাহান্নাম। আর জালেমদের কোনো সাহায্যকারী থাকবে না।’ (সুরা মায়েদা ৭২)

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে সমকক্ষ আহ্বান করতে করতে মৃত্যুবরণ করবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’ (সহিহ বুখারি)

তাওহিদই হওয়া উচিত মুসলিমের সমগ্র জীবনের লক্ষ্য। এমন তাওহিদ, যা হৃদয়, বিবেক ও জিহ্বাকে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে প্রার্থনা করা থেকে পবিত্র করবে, যা ইবাদতগুলোকে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য নিবেদন করা থেকে রক্ষা করবে, যা বিধান ও শরিয়তকে আল্লাহর আইন ও রাসুলের সুন্নাহ ব্যতীত অন্য কোনো উৎস থেকে গ্রহণ করা থেকে মুক্ত রাখবে। একই সঙ্গে তা মানুষের মনগড়া দর্শন, যুক্তিতর্ক ও পরিভাষার অনুসরণ থেকে দূরে রেখে সাহাবায়ে কেরাম এবং এই উম্মাহর সালাফদের উপলব্ধি অনুযায়ী দ্বীনকে বুঝতে সাহায্য করবে।

দ্বিতীয় বিষয় হলো, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনাদর্শ এমন এক মহান পথনির্দেশনা, যার অনুসরণের মাধ্যমেই হেদায়েত, নিরাপত্তা, কল্যাণ ও মুক্তি অর্জিত হয়। মহান আল্লাহ দুনিয়া ও আখেরাতের সৌভাগ্যকে তার সুন্নাহ অনুসরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন এবং দুর্ভাগ্য, ভয়, পথভ্রষ্টতা ও ব্যর্থতাকে তার আদর্শের বিরোধিতার সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যদি তার আনুগত্য করো, তবে হেদায়েতপ্রাপ্ত হবে। আর রাসুলের দায়িত্ব তো কেবল সুস্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়া।’ (সুরা নুর ৫৪)

এখন মুসলিম উম্মাহ যে মতভেদ, বিভ্রান্তি, ধর্মীয় বিশৃঙ্খলা, বিভিন্ন ফেতনা, বিভক্তি, গোষ্ঠীবাদ ও নিন্দনীয় দলাদলির শিকার, তার মূল কারণ হলো সেই বিশুদ্ধ সুন্নাহর পথ থেকে বিচ্যুতি, যার ওপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবিরা এবং তাদের অনুসরণকারী তাবেয়িরা প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। এসব ফেতনার কারণ হলো প্রবৃত্তির অনুসরণ, বেদআত, নিন্দনীয় মতামতের অনুসরণ, কেবল বুদ্ধিনির্ভর চিন্তাধারা এবং ব্যক্তিগত রুচিকে শরিয়তের ওপর প্রাধান্য দেওয়া। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা তার আদেশের বিরোধিতা করে, তারা যেন সতর্ক থাকে, অন্যথায় তাদের ওপর কোনো ফেতনা আপতিত হবে অথবা তাদের ওপর মর্মন্তুদ শাস্তি নেমে আসবে।’ (সুরা নুর ৬৩)

হে মুসলিম উম্মাহ! হে উম্মাহর জ্ঞানীরা! সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরুন, তাহলে আপনারা হেদায়েতপ্রাপ্ত হবেন। নববী সুন্নাহর অনুসারী হোন এবং তার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করুন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আমি তোমাদেরকে আল্লাহভীতির উপদেশ দিচ্ছি এবং শাসকের আনুগত্যের নির্দেশ দিচ্ছি, যদিও তোমাদের ওপর কোনো দাসকে শাসক নিযুক্ত করা হয়। কারণ তোমাদের মধ্যে যে আমার পরে জীবিত থাকবে, সে বহু মতভেদ দেখতে পাবে। তখন তোমরা আমার সুন্নাহ এবং আমার পরবর্তী হেদায়েতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরবে। তা দাঁত দিয়ে শক্ত করে ধরে রাখবে। আর নতুন উদ্ভাবিত বিষয় থেকে সতর্ক থাকবে। কেননা প্রতিটি নব উদ্ভাবিত বিষয় বেদআত এবং প্রতিটি বেদআতই পথভ্রষ্টতা।’ (আবু দাউদ)

হে আল্লাহ! পৃথিবীর সর্বত্র মুসলমানদের হেফাজত করুন। তাদের দুঃখ-কষ্ট দূর করুন এবং তাদের কাজকর্ম সহজ করে দিন। তাদের শত্রুদের অপদস্থ করুন। হে আল্লাহ! মুসলিমদের সব দায়িত্বশীল নেতাকে এমন কাজে সফল করুন, যাতে তাদের অধীনস্ত জনগণের কল্যাণ নিহিত রয়েছে।

১২ জুন শুক্রবার, মসজিদে নববীতে প্রদত্ত জুমরা খতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন

মুফতি আতিকুর রহমান