বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হককে নিয়ে আওয়ামী লীগ আমলের একটি ঘটনা গতকাল জাতীয় সংসদের আলোচনায় তুলেন ঢাকা-১ আসনের বিএনপির এমপি খোন্দকার আবু আশফাক। সরকারি ও বিরোধী দলের অনুরোধে বক্তব্যটি এক্সপাঞ্জ করে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘মাওলানা মামুনুল হকের বিষয়টি সংসদের কার্যবিবরণীতে আসার প্রয়োজন নেই। তাছাড়া এখনো কিন্তু তিনি (মামুনুল হক) তার অবস্থান পরিষ্কার করেননি। একজন রাজনৈতিক নেতার জীবনের অন্ধকার অংশ এখানে আলোচিত হোক, চাই না।’
গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় খোন্দকার আবু আশফাক বলেন, ‘মাওলানা মামুনুল হক অনেক বড় বড় কথা বলছেন। বাজেট নিয়ে তিনি সরকারের পতন ঘটাবেন, অনেক কিছু ঘটাবেন। কিন্তু তিনি যে গাজীপুরে নারীসহ ধরা পড়লেন, মুতা বিয়ের নামে, সেটা আসলে কী ছিল?’
এমপি বলেন, ‘ছাত্রশিবির নেতা জিসান... এই ইতিহাসও আপনারা...।’ এ সময় প্রধানমন্ত্রীকে কিছু একটা বলতে দেখা যায়। তখন বক্তব্যের ইস্যু পরিবর্তন করেন খোন্দকার আবু আশফাক।
এক পর্যায়ে আবু আশফাক মুতা বিয়ের বিষয়ে স্পিকারের কাছে জানতে চান। জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘অপ্রাসঙ্গিক কোনো বিষয় বক্তব্যে না আনাই ভালো। একজন রাজনৈতিক নেতার পরকীয়া সম্পর্কে আপনি মন্তব্য করেছেন। সাধারণত যার এখানে এসে জবাব দেওয়ার সুযোগ নেই, তার সম্পর্কে অভিযোগ তোলা সংসদে সমীচীন নয়। মুতা বিয়ে সম্পর্কে আমার কাছে কেন জানতে চাইলেন? আমাকে এসবের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মনে হয়? মুতা বিয়ে হলো সম্ভবত কেউ বিদেশে গেলে, আগের কালে নিয়ম ছিল, সাময়িক এক মাসের জন্য সোকল্ড বিয়ে করতে পারতেন বা একজন সঙ্গী খুঁজে নিতে পারতেন। এগুলো নিয়ে সংসদে আলোচনা না করা ভালো।
পরে পয়েন্ট অব অর্ডারে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, মামুনুল হক সাহেবের বিষয়ে যে তথ্য দিয়েছেন, এটা একেবারেই ভুল তথ্য। উনি মুতা বিয়ে করেন নাই। গাজীপুরে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটে নাই। তাকে হেনস্তা করা হয়েছিল নারায়ণগঞ্জে। উনি বিয়ে করেছিলেন, এটা এস্টাবলিশড। বিয়ে করা জায়েজ। এরপর তিনি মামুনুল হককে নিয়ে বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার অনুরোধ করেন।
ওভেন-ওয়াশিং মেশিন নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য : জাতীয় সংসদে দুদিন ধরে মাইক্রোওয়েভ ওভেন আর ওয়াশিং মেশিন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। গত বুধবার সংসদ সদস্যদের জন্য বরাদ্দকৃত ফ্ল্যাটগুলোতে ওয়াশিং মেশিন ও মাইক্রোওভেন দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান। একইসঙ্গে তিনি ফ্ল্যাটগুলোর দরজা-জানালায় পর্দা লাগানোরও দাবি জানিয়েছিলেন। তার এই দাবির বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা করেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ। একই সঙ্গে প্রয়োজনে তিনি মাইক্রোওয়েভ ওভেন দিতেও চেয়েছেন। এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। এ সময় স্পিকার বলেছেন, আর বাড়াবাড়ির দরকার নাই।
গতকাল বিকেলে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে পার্থ বলেন, ‘পয়েন্ট অব অর্ডার সংসদ চলাকালীন বা সংসদের ব্যাপারে হতে হবে। এজন্য আমি মনে করলাম, এটা ব্রডার কনটেক্সটে সংসদকে ইফেক্ট করে। অনেক কষ্টের পরে পার্লামেন্ট পেয়েছি এবং আমি প্রথম স্পিচেও বলেছিলাম, বেস্ট পার্ট অব দ্য পার্লামেন্ট এই যে, এখানে স্বৈরাচারের কোনো দোসর বা ফ্যাসিস্টের কেউ নেই। গত পার্লামেন্টে শুধু গণতন্ত্রের হত্যা হয়নি, পার্লামেন্টের স্ট্যান্ডার্ডকে সাংঘাতিকভাবে নষ্ট করেছে।’
পার্থ বলেন, ‘আমার কাছে মনে হচ্ছে যে, ডাইরেক্টলি ওদিকে না গেলেও কিছু কিছু জায়গায় কিন্তু আমরা ওদিকে চলে যাচ্ছি। আমরা কিন্তু মেম্বার অব পার্লামেন্ট ছাড়াও অ্যাম্বাসেডরস অব দ্য পার্লামেন্ট। আমরা যখন বাইরে কোথাও যাই পার্লামেন্টকে রিপ্রেজেন্ট করি। কালকে (পরশু দিন) পার্লামেন্ট থেকে যাওয়ার পরে আমি অনেক টেলিফোন পাই এবং সেখানে আমি ডিফেন্ড করার চেষ্টা করি। ডেইলি স্টার নিউজ করে, জামায়াত এমপির ডিমান্ডস ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ, অ্যান্ড কার্টিনস এইটা আমাকে অনেক লজ্জা দেয়। আমি মনে করি, এই পার্লামেন্টকে অনেক লজ্জা দেয়Ñ একটা মেম্বার অব পার্লামেন্ট যেখানে দাঁড়িয়ে জনগণের কথা, জনগণের দাবির কথা বলবে, সেখানে একজন মেম্বার অব পার্লামেন্ট দাঁড়িয়ে ওয়াশিং মেশিন পেল না, মাইক্রোওয়েভ পেল না, ... সেই ব্যাপারে কথা বলবে?’
এ পর্যায়ে তিনি নির্বাচনের আগে ১১ দলীয় জোটের সংসদ সদস্যদের গাড়ি ও প্লট না নেওয়ার ঘোষণা স্মরণ করে দেন। পার্থ বলেন, আগামীতে যদি তার পর্দা বা মাইক্রোওয়েভ লাগে আমি আমার তরফ থেকে তাকে একটা মাইক্রোওয়েভ দিতে চাই এবং আমি প্রধানমন্ত্রীকে রিকোয়েস্ট করতে চাই, যদি ওয়াশিং মেশিনটা উনি দেন এবং হোম মিনিস্টার থাকলে আমি বলতাম যে, উনি পর্দাটা যদি কিনে দেন, তাহলে তার সংসারটা আমরা বোঝায়ে দিতে পারতাম। তারপরও যদি আমার পার্লামেন্টকে উনি এমব্যারেস না করতেন।
পার্থর বক্তব্যের প্রতিবাদে জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, মাননীয় সদস্য (পার্থ) পয়েন্ট অফ অর্ডারে দাঁড়িয়ে যে কথাগুলো বলেছেন, আপনি (স্পিকার) তো প্রথমেই নাকচ করেছেন, এটা পয়েন্ট অফ অর্ডারের বিষয় না। দুই, একজন সদস্য (জামায়াত নেতা মজিবুর রহমান) তিনি সবার জন্য একটা বিষয় চেয়েছেন। কিন্তু তিনি এইটাকে সূত্র ধরে আবার আরেকটা যে গাড়ি বাড়ি সব নিয়ে এলেন। উনি তো আমি মনে করি, একজন বিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান। আমার নিজের থেকে অফারও দিয়ে দিলেন যে, আমি সব দিয়ে দেব। ওনার কাছে চাইছে নাকি কেউ যে, উনি দেবেন? আমার মনে হয় যে, আমাদের মানসিকতাগুলো এমন হওয়া উচিত যেটা এখানে দাঁড়িয়ে অন্তত কেউ কারও সম্মানে আমরা আঘাত করব না।
এ বিষয়ে স্পিকার বলেন, ‘মাননীয় বিরোধী দলের নেতা এটা নিয়ে কোনো বিতর্ক হোক এটা আমি চাই না। আমি মনে করি, এটা সংসদে না বললেও ভালো হতো। কিন্তু এটা বলে এমন কোনো অপরাধও তিনি করেননি। এই সামান্য জিনিস নিয়ে একে আর তর্ক-বিতর্ক করতে চাই না। আমরা সবাই কেয়ারফুল থাকব।’