ইরান মিশনে ভ্যান্সের ঝুঁকি

শান্তি সফল হলে নায়ক, ব্যর্থ হলে শেষ

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সামনে এখন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ইরানের সাথে তিন মাস ধরে চলা যুদ্ধ অবসানের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন তিনি। এই কূটনৈতিক তৎপরতা ভ্যান্সের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার এবং হোয়াইট হাউসের পরবর্তী উত্তরাধিকারী হওয়ার সম্ভাবনাকে নতুন রূপ দিতে পারে।

গত বুধবার (১৭ জুন) যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সাময়িক শান্তি চুক্তিতে সম্মত হয়েছে। এর ফলে আপাতত শত্রুতা স্থগিত করা হলেও মূল সমস্যাগুলোর সমাধান এখনো অধরা। ইরানকে ঘিরে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলো যেমন তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী নিয়ে আলোচনার জন্য ৬০ দিন সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই আলোচনা ভ্যান্সের জন্য যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্যও। পরিস্থিতি এখনো বেশ অনিশ্চিত। আলোচনার সূত্রপাত করতে ভ্যান্সের বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) রাতে সুইজারল্যান্ড যাওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা বাতিল করেন। তবে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মার্কিন প্রতিনিধি দল যেকোনো সুযোগেই রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছে।

এই গুরুত্বপূর্ণ সময়েই ভ্যান্সের ক্যাথলিক ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার অভিজ্ঞতার ওপর লেখা বই ‘কমিউনিয়ন’ প্রকাশিত হয়েছে। বইয়ের প্রচারণায় তিনি মিডিয়া ট্যুর করছেন এবং একই সাথে ইরানের সাথে শান্তি চুক্তির প্রধান প্রবক্তা হিসেবে নিজেকে তুলে ধরছেন। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের সংবাদ সম্মেলনে তিনি চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে মার্কিন ইতিহাসে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অন্যতম কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন তিনি। তবে ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের লড়াইয়ে নামার কোনো পরিকল্পনা আছে কি না—এমন প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান তিনি।

ভ্যান্স বলেন, ‘ইরান যদি তাদের আচরণ পরিবর্তন না করে, তবে তাদের সামরিক সক্ষমতা ও পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করে দেওয়া হবে। কিন্তু তারা যদি আচরণ বদলায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের সাথে তাদের সম্পর্কের আমূল পরিবর্তন আসবে।’

রিপাবলিকান দলীয় সতীর্থরা ভ্যান্সের এই ভূমিকাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছেন। দলের প্রবীণ পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম ভ্যান্সকে এই শান্তি চুক্তির ‘স্থপতি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে ভ্যান্সকেই তা অনুমোদনের জন্য সিনেটে উপস্থাপন করতে হবে।

অন্যদিকে, জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিষয়টি নিয়ে রসিকতা করে বলেন, ‘যদি এটি সফল হয়, তবে আমি কৃতিত্ব নেব। আর যদি ব্যর্থ হয়, তবে আমি জেডিকে দোষ দেব!’

ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আনবেন এবং ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে আনবেন। তবে বাস্তবে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে এবং গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি ইরানে হামলাও চালিয়েছেন। অনেক রিপাবলিকান মিত্রের অভিযোগ, যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ কমাতে ট্রাম্প ইরানকে বড় ধরনের ছাড় দিচ্ছেন।

যদিও ট্রাম্প এই সাময়িক শান্তি চুক্তিকে সামরিক ও কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে দাবি করছেন, তবে সমালোচকদের মতে, যুদ্ধের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত তাঁর অধিকাংশ লক্ষ্যই পূরণ হয়নি। ইরানের ধর্মতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় টিকে আছে, তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভাণ্ডারও অক্ষত। এছাড়া লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো ইসরায়েলবিরোধী মিলিশিয়াদের প্রতি তাদের সমর্থন অব্যাহত রয়েছে।

প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে ভ্যান্সকে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে, বিশেষ করে ট্রাম্পের নিম্নমুখী জনপ্রিয়তা মাথায় রেখে। তিনি অর্থনৈতিক উন্নয়নের ছোটখাটো দিকগুলো তুলে ধরে বলছেন, ‘আরও অনেক কাজ বাকি আছে।’ ভ্যান্স বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের ওপর কিছুটা আস্থা রাখুন। তিনি আমেরিকানদের জন্য ক্ষতিকর কোনো চুক্তি করবেন, তা ভাবাই অবান্তর।’

তবে কনজারভেটিভ মিডিয়া ব্যক্তিত্ব বেন শাপিরোর মতে, ভ্যান্স প্রেসিডেন্টকে যথাযথ পরামর্শ দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। মজার বিষয় হলো, এই স্পর্শকাতর কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেও ভ্যান্স তাঁর বইয়ের প্রচার চালাতে ছাড়ছেন না। এমনকি এবিসি-র জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘দ্য ভিউ’-তে ইরান, অভিবাসন ও নাগরিক অধিকার নিয়ে কঠিন প্রশ্নের মুখেও তিনি রসিকতা করে বলেছেন, ‘চলুন বই নিয়ে কথা বলি, আমি তো এখানে বই বিক্রি করতেই এসেছি।’

পর্যবেক্ষকদের মতে, পররাষ্ট্রসচিব মার্কো রুবিওকে বাদ দিয়ে ভ্যান্সকে সামনে আনাটা ট্রাম্পের এক সুদূরপ্রসারী কৌশল। হোয়াইট হাউসের ঘনিষ্ঠ এক সূত্র জানায়, ট্রাম্প আদতে একটি ‘রিয়েল-টাইম ট্রায়াল’ বা পরীক্ষা চালাচ্ছেন। এটি ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের মন্ত্রিসভা পরিচালনার চিরাচরিত ধরন। ভ্যান্সের জন্য এই দায়িত্ব যেমন একটি বড় সুযোগ, তেমনি তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

সূত্র: রয়টার্স