যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার মুখে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখে চোখে চোখ রেখে লড়াই করেছে ইরান। উল্টো উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনার পাশাপাশি ইসরায়েলের অভ্যন্তরে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা দেশটির সামরিক সামর্থ্যরে জানান দিয়েছে। ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র কখনোই এসব হামলায় ধ্বংসযজ্ঞের প্রকৃত চিত্র সামনে না আনলেও, স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে। গতকাল শুক্রবার এক প্রতিবেদনে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) যুক্তরাষ্ট্রের সেনা বা ঘাঁটি রয়েছে এমন উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালানোর জন্য ইরাকে নতুন গোপন সেল গঠন করেছে। মূলত গোয়েন্দাদের নজর এড়াতে এবং ইরাকের পরিচিত মিলিশিয়া বা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে পাশ কাটাতেই এই নতুন সেলগুলো তৈরি করা হয়েছে। ইরাকের আটটি সূত্র রয়টার্সকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। রয়টার্সের এই আটটি সূত্রের মধ্যে দুজন ইরাকি সামরিক কর্মকর্তা, একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং পাঁচজন স্থানীয় মিলিশিয়া কমান্ডার রয়েছেন।
তিনটি সূত্র জানায়, আইআরজিসি ইরাকে তিন থেকে চারটি সেল তৈরি করেছে, যার প্রতিটিতে প্রায় ১০ জন করে বাছাই করা ইরাকি শিয়া যোদ্ধা রয়েছেন। এই সেলগুলো ২০ এপ্রিল থেকে ১৭ মে পর্যন্ত দক্ষিণ ইরাকের বসরা এবং সামাওয়া শহরের কাছের মরুভূমি থেকে কুয়েত, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে অন্তত সাতটি ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সূত্রগুলোর মতে, এসব সেলের অনেক সদস্যকে ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক নামের জোটভুক্ত গোষ্ঠীগুলো থেকে নেওয়া হয়েছে। তবে নতুন সেলগুলো ওই জোটের কমান্ড কাঠামোর বাইরে থেকে সরাসরি আইআরজিসির কাছে জবাবদিহি করে।
কৌশল পাল্টাচ্ছে আইআরজিসি
ইরাকে নতুন এই গোপন সেল তৈরির বিষয়টি আগে কখনো প্রকাশ পায়নি। পাঁচজন মিলিশিয়া কমান্ডার জানিয়েছেন, আইআরজিসি মূলত তাদের কৌশলে পরিবর্তন আনছে। ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো (প্রক্সি) বর্তমানে দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং খোদ ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পদও ফুরিয়ে আসছে। এ অবস্থায় পুরো অঞ্চলে নিজেদের শক্তি বজায় রাখতেই ইরান এই নতুন ছক কষেছে। শিয়া-সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরাকে অনেক মিলিশিয়া গোষ্ঠী রয়েছে, যাদের বেশির ভাগেরই তেহরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। গাজা ও লেবানন থেকে শুরু করে ইয়েমেন ও ইরাক পর্যন্ত বিস্তৃত ইরানের আঞ্চলিক ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধ বলয়ের অন্যতম প্রধান খুঁটি হলো এই গোষ্ঠীগুলো। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে, ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’-এর ব্যানারে কাজ করা গোষ্ঠীগুলো ইরাকে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদের ওপর কয়েক ডজন ড্রোন ও রকেট হামলার দায় স্বীকার করেছে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও বেশ কয়েকটি প্রাণঘাতী বিমান হামলা চালিয়েছে। তবে ইরাকের ভেতরে ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর কোনো বড় ধরনের সামরিক তৎপরতা বা সমাবেশ দেখা যায়নি।
গত বছর থেকেই সেখানকার বেশ কয়েকটি শক্তিশালী শিয়া গোষ্ঠী ইঙ্গিত দিয়ে আসছিল যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে সংঘাত এড়াতে তারা অস্ত্র সমর্পণ করতে এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মনোযোগ দিতে প্রস্তুত। শিয়া শাসক জোটের দুই আইনপ্রণেতা এবং ইরাকি সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল জসিম আল-বাহাদলি জানান শিয়া গোষ্ঠীগুলোর এমন সিদ্ধান্তের কারণেই হয়তো আইআরজিসি সরাসরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নতুন দল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। ইরাকের মাটিতে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ভেঙে দেওয়ার জন্য বাগদাদ সরকারকে বারবার সতর্ক করে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসনের হুঁশিয়ারির পর চলতি মাসেই ‘আসাইব আহল আল-হাক’ এবং ‘ইমাম আলি ব্রিগেডস’ নামে দুটি গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় কর্র্তৃপক্ষের কাছে অস্ত্র সমর্পণ শুরু করার ঘোষণা দেয়। শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী বিষয়ে বিশেষজ্ঞ আল-বাহাদলি বলেন, আইআরজিসি গঠিত নতুন দলগুলো তুলনামূলকভাবে ছোট, আদর্শিকভাবে আরও কঠোর এবং অধিক নিয়ন্ত্রিত। অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে সম্পদের ব্যবহার সীমিত রাখার প্রয়োজন থেকেই ইরান এমন পথ বেছে নিয়েছে বলে তিনি মনে করেন।