এক গোলরক্ষকের মারাত্মক ভুলে যেখানে দল পুড়ল হতাশায়, সেখানেই প্রতিপক্ষ দলের গোলরক্ষকের অবিশ্বাস্য এক সেভে দল সোজা দ্বিতীয় রাউন্ডে! সেটিও আবার সবার আগে।
গল্পটা মেক্সিকো ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যকার ম্যাচের। কিছুটা ফ্ল্যাশব্যাকে যাওয়া যাক। লস অ্যাঞ্জেলেসের গ্যালারিতে তখন ম্যাচের ঘড়িতে ৮৭ মিনিট। ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকা মেক্সিকোর বিশ্বমঞ্চের নকআউট পর্ব নিশ্চিত হতে আর মাত্র কয়েক মিনিটের অপেক্ষা। ঠিক তখনই মেক্সিকান ডিফেন্স ভেঙে আচমকা হানা দেয় দক্ষিণ কোরিয়া। কিন্তু স্বাগতিক সমর্থকদের স্তব্ধ হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে মেক্সিকোর গোলপোস্টের নিচে যেন এক অতিমানবীয় প্রাচীর হয়ে দাঁড়ালেন রাউল রেঞ্জেল। তার ডান হাতের অবিশ্বাস্য এক ‘রিঅ্যাকশন সেভে’ সমতায় ফেরার নিশ্চিত সুযোগ হারায় কোরিয়া। আর এই শ্বাসরুদ্ধকর সেভের ওপর ভর করেই ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম দল হিসেবে সবার আগে ‘রাউন্ড অব থার্টি-টু’ বা শেষ বত্রিশ নিশ্চিত করে মেক্সিকো।
গুয়াদালাহারায় ‘এ’ গ্রুপের এই ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়াকে ১-০ গোলে হারায় মেক্সিকানরা। প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২-০ ব্যবধানে হারানোয় ২ ম্যাচে ৬ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের শীর্ষস্থান মজবুত করার পাশাপাশি এক ম্যাচ হাতে রেখেই প্রথম দল হিসেবে নকআউট পর্বের টিকিট কাটল তারা।
অথচ নিজেদের চেনা মাঠে প্রথমার্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার গতিশীল ফুটবলের বিপক্ষে বেশ কঠিন পরীক্ষাই দিতে হয়েছিল মেক্সিকোকে। ম্যাচের ৫৭ শতাংশ সময় বল দখলে রেখে মেক্সিকান রক্ষণভাগে ভীতি ছড়াচ্ছিল কোরিয়ানরা। তবে ম্যাচের ডেডলক ভাঙে দ্বিতীয়ার্থের শুরুতেই, ম্যাচের ৫০ মিনিটে। বাম প্রান্ত থেকে হুলিয়ান কিনোনিয়োসের ক্রস বক্সে খুঁজে নেয় রাউল জিমেনেজকে। সেখানে জিমেনেজের হেড বাতাসে ভেসে উঠলে তা তালুবন্দি করতে গোললাইন ছেড়ে সামনে এগিয়ে আসেন দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞ গোলরক্ষক কিম সেউং-গিউ। কিন্তু অবিশ্বাস্য এক ভুলে সহজ বলটি তার হাত ফসকে সামনে পড়ে যায়। সেখানে ওঁৎ পেতে থাকা মেক্সিকান মিডফিল্ডার লুইস রোমো নিখুঁত শটে বল জালে জড়িয়ে উল্লাসে ভাসান পুরো স্টেডিয়াম।
গোল হজম করার পর মরিয়া হয়ে আক্রমণে ওঠে দক্ষিণ কোরিয়া। তবে কোরিয়ান গোলরক্ষক যেখানে দলকে বিপদে ফেলেছিলেন, মেক্সিকান গোলরক্ষক রাউল রেঞ্জেল ঠিক তার উল্টো চিত্রনাট্য লিখলেন। চো গু-সাংয়ের হেড একদম কাছ থেকে রুখে দেওয়ার পর ফিরতি বলে ইয়াং হিউন-জুনের শটও নিজের শরীর উজাড় করে আঙুলের ডগা দিয়ে বাইরে ঠেলে দেন তিনি। ম্যাচ শেষে নিজের সেই জাদুকরী মুহূর্ত নিয়ে ২৬ বছর বয়সী রেঞ্জেল বলেন, ‘এটি খুব দ্রুত ঘটেছিল, এটি ছিল পুরোপুরি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া (পিওর রিঅ্যাকশন)। আমি ঠিক কী দেখেছিলাম তা আপনাকে বলতে পারব না, কারণ আমার শুধু মনে আছে সতীর্থের সঙ্গে ধাক্কা লাগার পর বলটি আমার নিয়ন্ত্রণে আসার মুহূর্তটি। তবে আমি ভীষণ মনোযোগী ছিলাম এবং দল যখনই আমাকে চেয়েছিল, পাশে দাঁড়াতে পেরে খুশি।’
নিয়মিত গোলরক্ষকের চোটে হঠাৎ সুযোগ পাওয়া রেঞ্জেলের ওপর পূর্ণ আস্থা ছিল মেক্সিকান কোচ হাভিয়ের আগুয়েরে। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, ‘প্রথমবার ওকে যখন জাতীয় দলে ডেকেছিলাম, তখন থেকেই ও আমাকে দারুণ এক সংকল্প দেখিয়েছে। এই মৌসুমে নিজের ক্লাবের হয়েও সে দুর্দান্ত খেলেছে। তালা (রেঞ্জেল) তার নিজের ঘরে খেলছে এবং সে দারুণ সুখী। ওর জন্য ভীষণ আনন্দিত।’
অন্যদিকে, গোলরক্ষকের মারাত্মক ভুলে ম্যাচ হারলেও ভেঙে পড়ছেন না দক্ষিণ কোরিয়ার কোচ হং মিউং-বো। খেলোয়াড়দের মাথা উঁচু রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যে গোলটি আমরা হজম করেছি তা দুঃখজনক, তবে মাথা নত করার কোনো প্রয়োজন নেই। ফলাফলটি হতাশাজনক হলেও, আমি মনে করি এই ম্যাচের জন্য আমরা যে পরিকল্পনা করেছিলাম খেলোয়াড়রা তা মাঠে ভালোভাবেই বাস্তবায়ন করেছে।’