আজকের পৃথিবীতে হেইট স্পিচ বা বিদ্বেষমূলক বক্তব্য শুধু ভাষার সমস্যা নয়; এটি মানবাধিকার, গণতন্ত্র, সামাজিক সম্প্রীতি এবং সভ্য সহাবস্থানের জন্য এক গভীর হুমকি। প্রযুক্তির বিস্তার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অভূতপূর্ব প্রসারের ফলে মানুষের মতপ্রকাশের ক্ষেত্র যেমন বিস্তৃত হয়েছে—তেমনি বিদ্বেষ, অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতাকে উসকে দেওয়ার নতুন নতুন পথও তৈরি হয়েছে।
তাই হেইট স্পিচ মোকাবিলার প্রশ্নটি আজ কেবল আইনি বা প্রযুক্তিগত কোনো প্রশ্ন নয়—এটি একই সঙ্গে নৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক প্রশ্ন। রাষ্ট্রব্যবস্থা, রাজনীতি ও সমাজ এটাকে অনেক ক্ষেত্রেই উৎসাহিত করছে। এর বিরুদ্ধে শুভবোধসম্পন্ন মানুষের জাগরণ জরুরি।
শনিবার (২০ জুন) রাজধানীর ধানমণ্ডিতে পেন বাংলাদেশ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা এই অভিমত ব্যক্ত করেন।
পেন বাংলাদেশের নির্বাহী সদস্য ও কথাশিল্পী মুহাম্মদ মহিউদ্দিনের সঞ্চালনায় ‘বিদ্বেষমূলক বক্তব্য মোকাবিলা: চ্যালেঞ্জ ও প্রতিক্রিয়া’ শীর্ষক এই আলোচনায় অংশ নেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আইনুন নাহার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পিস এন্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, দেশ রূপান্তর সম্পাদক ও বহুমাত্রিক লেখক মুস্তাফিজ শফি, ইউনিভার্সিটি অফ লিবারেল আর্টস এর সহকারী অধ্যাপক অবন্তী হারুণ।
শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন পেন বাংলাদেশের সহসভাপতি কথাসাহিত্যিক পারভেজ হোসেন, অধ্যাপক ও কবি শামীম রেজা। অনলাইনে শুভেচ্ছা জানান পেন বাংলাদেশের সভাপতি ও ইউল্যাবের উপাচার্য অধ্যাপক সামসাদ মর্তুজা।
বক্তারা বলেন, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য মোকাবিলায় শুধু আইন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা। ঘৃণার বিপরীতে আমাদের দাঁড় করাতে হবে সহমর্মিতা, যুক্তি ও মানবিকতার ভাষা। সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতি এবং শিক্ষা এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক এবং বুদ্ধিজীবীদের দায়িত্ব হলো সমাজে এমন একটি নৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি করা—যেখানে ভিন্ন পরিচয়, ভিন্ন বিশ্বাস এবং ভিন্ন মতকে শত্রু হিসেবে নয়, বরং মানবিক বৈচিত্র্যের অংশ হিসেবে দেখা হবে। একইভাবে গণমাধ্যমের দায়িত্ব হলো গুজব ও অপপ্রচার প্রতিরোধ করা, যাচাইকৃত তথ্য পরিবেশন করা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর তুলে ধরা।
তারা বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে, বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে লড়াই শেষ পর্যন্ত মানবিকতার পক্ষে লড়াই। ঘৃণার ভাষা যত শক্তিশালী হবে—আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং নাগরিক সাহসের ভাষাকেও তত শক্তিশালী করে তুলতে হবে। কারণ কোনো সমাজ তখনই সত্যিকার অর্থে সভ্য হয়ে ওঠে, যখন সে তার ভিন্নমত, ভিন্ন বিশ্বাস এবং ভিন্ন জীবনধারার মানুষদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।