প্রেমিকের ছুরিকাঘাতে রোজিনা আক্তার (৩৮) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত শনিবার রাত ১০টার দিকে তার মৃত্যু হয়। আগের দিন শুক্রবার রাজধানীর বাড্ডা থেকে মাওয়ায় ঘুরতে নিয়ে সেখানকার একটি চরে রোজিনাকে ছুরিকাঘাত করেন প্রেমিক টুটুল। আহতাবস্থায় সেদিন রাতেই তাকে ঢাকায় এনে হাসপাতালে ভর্তি করান এক মাঝি ও পরিবারের লোকজন। তবে ছুরিকাঘাতের ঘটনাস্থল নিয়ে জটিলতা দেখা দেওয়ায় গতকাল রবিবারও তার মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়নি। রোজিনার মরদহে মর্গে পড়ে আছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, রোজিনার স্বামী মো. আউয়াল সৌদি আরব প্রবাসী। রেজিনার বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলায়। এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে রোজিনা মেরুল বাড্ডায় থাকতেন। ছেলের বয়স ১০ বছর ও মেয়ের বয়স আড়াই বছর। ছেলে হাফেজি পড়ালেখা করে।
রোজিনার নিকটাত্মীয় আনোয়ার জানান, রোজিনা যেই বাসায় ভাড়া থাকেন তার একটি ভবন পরই টুটুলের রঙ ও হার্ডওয়্যারের দোকান রয়েছে। বছর দেড়েক আগে রোজিনা ওই দোকানে রঙ কিনতে যান। তিনি দোকান বন্ধ পান। তখন দরজায় লেখা থাকা নম্বরে টুটুলকে কল করে দোকান কখন খুলবে জানতে চান। এভাবে রোজিনার নাম্বার পান টুটুল। পরে টুটুল রোজিনার নাম্বারে প্রায়ই কল করতেন। একটা পর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। টুটুল প্রায়ই রোজিনাকে ঘুরতে যাওয়ার প্রস্তাব দিতেন। গত শুক্রবার বেলা ৩টার দিকে সিএনজিযোগে টুটুল রোজিনাকে নিয়ে মাওয়া ঘুরতে যান। সেখানে পদ্মা নদীর পাড়ে এক মাঝিকে এক হাজার টাকায় ভাড়া করেন। সেলিম নামের ওই মাঝি সন্ধ্যার দিকে তাদের নদীর মাঝখানে একটি চরে নামিয়ে দেন। এর কিছুক্ষণ পর সেলিম চিৎকারের শব্দ শুনে ওপরে গিয়ে দেখেন, রোজিনার দুই পা বাঁধা। শরীর থেকে রক্ত বের হচ্ছে। তার বুকের ওপরে বসে আছে টুটুল। পরে টুটুল ও সেলিম রোজিনাকে নৌকায় করে চর থেকে পাড়ে নিয়ে আসেন। এরপর একটি সিএনজিতে করে সেলিম রোজিনাকে নিয়ে ঢাকায় রওনা দেন। এরই মধ্যে টুটুল সটকে পড়েন। পথিমধ্যে রোজিনা আনোয়ারকে কল করলে আনোয়ার পোস্তাগোলা ব্রিজে যান। সেখানে রাত ৯টার দিকে রোজিনাকে বুঝিয়ে দিয়ে মাঝি সেলিম চলে যান।
আনোয়ার জানান, আহতাবস্থায় রোজিনা তাকে ঘটনার বিস্তারিত জানান। তবে আনোয়ারকে তিনি শিখিয়ে দেন পুলিশ ও আত্মীয় স্বজনকে যেন বলা হয়, টাকা তুলতে গিয়ে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে তিনি আহত হয়েছেন। প্রথম দিকে আনোয়ার সবাইকে রোজিনার শেখানো কথা বললেও পরে তিনি মারা গেলে প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরেন। রোজিনা তাকে জানিয়েছেন, টুটুল ক্যানসার রোগে আক্রান্ত।
আনোয়ার জানান, তিনি রোজিনাকে প্রথমে বাড্ডার একটি প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে রাত ১২টার দিকে ঢামেক হাসপাতালে নেওয়া হয়। রাতেই তার অপারেশন করানো হয় এবং পরের দিন শনিবার ভোরবেলায় তাকে বেডে দেওয়া হয়। এরপর রোজিনা স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করেন। সবার সঙ্গে কথাবার্তা বলেন। তবে চিকিৎসকরা জানান, রোজিনার আরেকটি অপারেশন করতে হবে। শনিবার সকাল ১০টার দিকে তাকে আবারও অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়। অপারেশনের পর তাকে বেডে দেওয়া হয়। রাত ১০টার দিকে তিনি মারা যান।
আনোয়ার জানান, গতকাল রবিবার তারা বাড্ডা থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ জানায়, রোজিনাকে যেই থানা এলাকায় ছুরিকাঘাত করা হয়েছে, সেই থানায় মামলা করতে হবে। এরপর স্বজনরা পদ্মা সেতু উত্তর থানায় যান। সেখানকার পুলিশ মাঝি সেলিমকে ডেকে ঘটনার বিস্তারিত শুনেন। ঘটনাটি নদীতে ঘটায় পদ্মা সেতু উত্তর থানা পুলিশ মাওয়া নৌপুলিশ ফাঁড়িকে জানায়। নৌপুলিশ সেলিমকে নিয়ে ঘটনাস্থল নির্ধারণে সেই চরে যায়।
পদ্মা সেতু উত্তর থানার ওসি মো. আকতার বলেন, পদ্মা নদীর মাঝখানে বিভিন্ন চর রয়েছে। সেখানকার একটি চরে ওই নারীকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। চর নৌপুলিশের আওতায় পড়েছে। তাই তাদের বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। তারা ঘটনাস্থল দেখে সীমানা নির্ধারণ করবে।