ফ্যাশনের পুরনো পথে নতুন হাঁটা

ফ্যাশনের জগতে মেয়েদের পোশাকের পরিবর্তন যত দ্রুত ঘটে, ছেলেদের ক্ষেত্রে সেই পরিবর্তন অনেকটাই ধীর। বছরের পর বছর জিন্স, টি-শার্ট কিংবা ফরমাল শার্টের বাইরে খুব বেশি কিছু দেখা যায় না। কিন্তু সময়ের চাকা ঘুরে যখন পুরনো কোনো ধারা নতুন রূপে ফিরে আসে, তখন সেটাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে আলোচিত ট্রেন্ড। বর্তমানে ছেলেদের ফ্যাশনে ঠিক তেমনই এক পরিবর্তন চোখে পড়ছে। শর্ট লুজ-ফিটিং শার্ট, বেলবটম বা ওয়াইড-লেগ প্যান্ট এবং তার সঙ্গে কেডস কিংবা স্নিকার্সের সমন্বয় তৈরি  বেহেমিয়ান লুক। লিখেছেন মোহসীনা লাইজু

ছেলেদের ফ্যাশনের এই নতুন ধারার অনেক উপাদানই নতুন নয়। সত্তর ও আশির দশকে জনপ্রিয় ছিল ঢিলেঢালা শার্ট ও বেলবটম প্যান্ট। তবে আধুনিক কাট, নতুন ফেব্রিকস ও সমসাময়িক স্টাইলিংয়ের কারণে পুরনো সেই ফ্যাশন এখন আবার নতুন প্রজন্মের কাছে ফিরে এসেছে ভিন্ন মাত্রায়। আরাম, আত্মবিশ্বাস এবং ব্যক্তিত্ব এই তিনের সমন্বয়েই জনপ্রিয় হচ্ছে এই ধারা।

লুজ-ফিটিং শর্ট শার্ট

এ সময়ের জনপ্রিয় পোশাক হচ্ছে শর্ট লুজ-ফিটিং শার্ট। এই শার্ট সাধারণত কোমর পর্যন্ত বা তার একটু নিচে লম্বা হয় এবং শরীরের সঙ্গে আঁটসাঁটভাবে লেগে থাকে না। ফলে এটি যেমন আরামদায়ক, তেমনি দেখতে লাগে স্মার্ট ও স্বতঃস্ফূর্ত। এই ধরনের শার্টে বিভিন্ন ডিজাইন দেখা যাচ্ছে। সলিড রঙের পাশাপাশি স্ট্রাইপ, চেক, ফ্লোরাল প্রিন্ট, জ্যামিতিক নকশা কিংবা রেট্রো মোটিফও বেশ জনপ্রিয়। বিশেষ করে মাটিরঙা, অফ-হোয়াইট, অলিভ গ্রিন, বেইজ, স্কাই ব্লু কিংবা প্যাস্টেল শেডের ব্যবহার বাড়ছে। এগুলো গরমের দিনে যেমন স্বস্তি দেয়, তেমনি চোখেও লাগে প্রশান্তিময়।

ফেব্রিকসের ক্ষেত্রেও বৈচিত্র্য এসেছে। কটন, লিনেন, কটন-লিনেন ব্লেন্ড এবং রেয়ন ফেব্রিকের শার্ট এখন বেশি দেখা যায়। লিনেন শার্ট গরম আবহাওয়ায় আরাম দেয়, অন্যদিকে কটন দীর্ঘ সময় পরেও স্বস্তি বজায় রাখে। যারা একটু ফ্যাশন-সচেতন, তারা রেয়ন বা ভিসকস ফেব্রিকের শার্ট বেছে নিতে পারেন, কারণ এগুলো শরীরে সুন্দরভাবে পড়ে এবং লুজ-ফিট কাটকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।

তবে এই শার্ট সবার জন্য একইভাবে মানানসই নয়। লম্বা ও মাঝারি গড়নের ছেলেদের ওপর লুজ-ফিট শার্ট সবচেয়ে ভালো মানায়। যাদের শরীর খুবই পাতলা, তাদের ক্ষেত্রে এই শার্ট শরীরকে কিছুটা ভারসাম্যপূর্ণ দেখায়। আবার যাদের ওএই ধরনের শার্ট ভালো বিকল্প, কারণ শরীরের অতিরিক্ত অংশ সহজেই আড়াল করতে পারে। তবে অল্প উচ্চতার ছেলেদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঢিলেঢালা শার্ট এড়িয়ে যাওয়াই ভালো, কারণ এতে উচ্চতা আরও কম মনে হতে পারে। তারা বেছে নিতে পারেন লুজ ফিটিং।

বেলবটম প্যান্টে রেট্রো ফ্যাশন

একসময় সিনেমার নায়কদের পরিচয়ের অংশ ছিল বেলবটম প্যান্ট। বহু বছর পর আবার সেই প্যান্টই ফিরে এসেছে আধুনিক রূপে। যদিও বর্তমানের বেলবটম আগের মতো অতিরিক্ত চওড়া নয়, বরং অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত এবং পরিমিত। এখনকার ডিজাইনে কোমরের অংশ ফিটেড থাকে, হাঁটু পর্যন্ত তুলনামূলক সরু এবং নিচের দিকে ধীরে ধীরে চওড়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে ওয়াইড-লেগ বা ফ্লেয়ার্ড কাটও ব্যবহার করা হচ্ছে, যা বেলবটমের আধুনিক সংস্করণ হিসেবে বিবেচিত।

ডেনিমের পাশাপাশি কটন টুইল, গ্যাবার্ডিন এবং ব্লেন্ডেড ফেব্রিকের বেলবটম প্যান্টও জনপ্রিয় হচ্ছে। কালো, ধূসর, বেইজ কিংবা গাঢ় নীল রঙের প্যান্ট সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। তবে সাহসী ফ্যাশনপ্রেমীরা অফ-হোয়াইট বা অলিভ রঙও বেছে নিচ্ছেন। এই ধরনের প্যান্টের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি শরীরের অনুপাতকে ভারসাম্যপূর্ণ দেখায়। লম্বা পা আরও দীর্ঘ দেখায় এবং পুরো লুককে দেয় একটি স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব। বিশেষ করে লুজ-ফিটিং শর্ট শার্টের সঙ্গে বেলবটম প্যান্টের সমন্বয় বর্তমানে তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়।

কেডস ও স্নিকার্স : স্টাইলের শেষ স্পর্শ

পোশাক যতই আকর্ষণীয় হোক, সঠিক জুতা ছাড়া ফ্যাশন সম্পূর্ণ হয় না। আর বর্তমান ট্রেন্ডে কেডস ও স্নিকার্স যেন বাধ্যতামূলক অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। সাদা কেডস এখনো সবচেয়ে জনপ্রিয়। কারণ এটি প্রায় সব ধরনের পোশাকের সঙ্গে মানিয়ে যায়। অন্যদিকে চাঙ্কি স্নিকার্স, রেট্রো রানিং শু কিংবা মিনিমালিস্ট ডিজাইনের স্নিকার্সও তরুণদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে।

 বেলবটম প্যান্টের সঙ্গে স্নিকার্সের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। প্যান্টের নিচের চওড়া অংশ জুতার ওপর সুন্দরভাবে পড়ে, ফলে পুরো লুকটিই অন্যরকম হয়। একই সঙ্গে স্নিকার্স উচ্চতায় সামান্য বাড়তি মাত্রা যোগ করে, যা স্টাইলকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। কেডস ও স্নিকার্সের আরেকটি সুবিধা হলো এগুলো দীর্ঘ সময় ব্যবহারের জন্য আরামদায়ক। তাই বিশ্ববিদ্যালয়, আড্ডা, ভ্রমণ কিংবা ক্যাজুয়াল অফিস সব জায়গাতেই সহজে ব্যবহার করা যায়।

ফরমাল না ক্যাজুয়াল কোথায় বেশি মানাবে

এই ট্রেন্ড মূলত ক্যাজুয়াল এবং স্মার্ট-ক্যাজুয়াল ফ্যাশনের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, ক্যাফেতে সময় কাটানো, ভ্রমণ, কনসার্ট, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা উইকএন্ড আউটিংয়ের জন্য এটি আদর্শ। তবে সঠিক রঙ ও ডিজাইন নির্বাচন করলে স্মার্ট-ক্যাজুয়াল অফিস লুকেও ব্যবহার করা সম্ভব। যেমন, সলিড রঙের লুজ-ফিট শার্ট, গাঢ় রঙের বেলবটম বা ওয়াইড-লেগ ট্রাউজার এবং মিনিমাল সাদা স্নিকার্সের সমন্বয় আধুনিক অফিস পরিবেশে বেশ মানানসই। অন্যদিকে একেবারে ফরমাল অনুষ্ঠান, করপোরেট মিটিং কিংবা সরকারি দাপ্তরিক পরিবেশে এই স্টাইল ততটা উপযোগী নয়। কারণ ফরমাল পোশাকের ক্ষেত্রে এখনো ক্লাসিক ফিট শার্ট, ট্রাউজার এবং ড্রেস শু-ই বেশি গ্রহণযোগ্য।

ব্যক্তিত্ব প্রকাশের নতুন ভাষা

ফ্যাশন কেবল পোশাক নয়; ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তোলে। বর্তমানের শর্ট লুজ-ফিটিং শার্ট, বেলবটম প্যান্ট এবং স্নিকার্সের ট্রেন্ড মূলত সেই স্বাধীনতার কথাই বলে। এখানে কড়াকড়ি নিয়মের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় আরাম, আত্মবিশ্বাস এবং নিজস্ব স্টাইলকে। সময়ের সঙ্গে ফ্যাশনের ধারা বদলাবে, নতুন ট্রেন্ড আসবে, পুরনো ট্রেন্ড হারিয়ে যাবে। কিন্তু এমন কিছু ধারা থাকে, যা বারবার ফিরে আসে নতুন পরিচয়ে। লুজ-ফিট শার্ট ও বেলবটম প্যান্টের বর্তমান জনপ্রিয়তা তারই প্রমাণ। পুরনো দিনের স্মৃতিকে আধুনিকতার ছোঁয়ায় নতুন করে উপস্থাপন করার এই প্রবণতা হয়তো আগামী কয়েক বছর ছেলেদের ফ্যাশনকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলবে।