ফুটবলে সমর্থকদের একটা বড় অংশ সব সময় ফলাফল দিয়েই বিচার করে। কোনো দল হেরে গেলে মনে করা হয় তারা খারাপ খেলেছে, আর জিতলেই সব ঠিক। কিন্তু একজন সাবেক ফুটবলার হিসেবে আমি বিষয়টাকে একটু ভিন্নভাবে দেখি। তাই অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে মেসির পেনাল্টি মিস হওয়ার পরও আর্জেন্টিনার জয় নিয়ে আমার মধ্যে কোনো হতাশা ছিল না। কারণ আমি দেখেছি, অস্ট্রিয়া সত্যিই খুব ভালো ফুটবল খেলেছে এবং আর্জেন্টিনাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছিল।
অনেকেই হয়তো শুধু ২-০ গোলের জয় দেখবেন। কিন্তু মাঠের খেলাটা যারা বিশ্লেষণ করবেন, তারা বুঝবেন অস্ট্রিয়া কতটা সংগঠিত এবং পরিকল্পিত ফুটবল খেলেছে। ম্যাচের শুরু থেকেই তারা আর্জেন্টিনাকে স্বাভাবিক ছন্দে খেলতে দেয়নি। মাঝমাঠে চাপ সৃষ্টি করেছে, জায়গা কমিয়ে দিয়েছে এবং বলের জন্য লড়াই করেছে। একপর্যায়ে মনে হয়েছে তারা আর্জেন্টিনাকে নাকানি-চুবানি খাইয়ে ছাড়ছে।
তবে বড় দলের পরিচয়ই হলো কঠিন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া। আর্জেন্টিনা সেটাই করেছে। এই দলটাকে আমি খুবই ব্যালান্সড একটি দল বলব। রক্ষণ, মাঝমাঠ এবং আক্রমণÑ তিন বিভাগেই তাদের সমন্বয় অসাধারণ। তারা কখন আক্রমণ করবে, কখন ম্যাচের গতি কমাবে, কখন ফলাফল ধরে রাখবে, এসব বিষয়ে তাদের পরিপক্বতা চোখে পড়ার মতো।
এই ম্যাচে আমার সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি নজরে এসেছে, তা হলো আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের পরিকল্পনা। পুরো দল যেন একটি লক্ষ্য নিয়েই খেলছে, কীভাবে মেসিকে গোল করার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত পরিস্থিতি তৈরি করা যায়। এটা শুনতে অনেকের কাছে অদ্ভুত লাগতে পারে। কিন্তু বড় খেলোয়াড়দের ঘিরে দলগুলো এমন পরিকল্পনাই করে।
লিওনেল মেসিকে কেন্দ্র করে আর্জেন্টিনার আক্রমণ সাজানো নতুন কিছু নয়। তবে এখন বিষয়টি আরও পরিণত ও সুসংগঠিত। তার ক্লাব ফুটবলে, বিশেষ করে ইন্টার মিয়ামিতে আমরা প্রায়ই দেখি সতীর্থরা বুঝে যায় মেসি কোথায় অবস্থান নেবে, কখন ফাঁকা জায়গায় যাবে এবং কোন মুহূর্তে তাকে বল দিতে হবে। জাতীয় দলেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
মেসি এখন আর ২৫ বছরের তরুণ নন যে পুরো মাঠজুড়ে দৌড়ে বেড়াবেন। তিনি এখন অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে খেলেন। ধীরে ধীরে এগোন, জায়গা খুঁজে নেন এবং অপেক্ষা করেন সঠিক মুহূর্তের। তার সবচেয়ে বড় শক্তি এখন খেলার গতি বোঝা এবং প্রতিপক্ষের ভুলের সুযোগ নেওয়া। তিনি জানেন বল কোথায় আসবে। আবার সতীর্থরাও জানে, কোন জায়গায় মেসিকে খুঁজে পাওয়া যাবে।
আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা যেন সেই অনুযায়ী পুরো আক্রমণ সাজায়। তারা মেসির জন্য জায়গা তৈরি করে, তাকে বল দেওয়ার পথ খুলে দেয় এবং প্রতিপক্ষের মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দেয়। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন লাউতারো মার্তিনেজ। তিনি প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের ব্যস্ত রাখেন, তাদের অবস্থান নষ্ট করেন এবং এমন পরিস্থিতি তৈরি করেন যাতে মেসি তুলনামূলকভাবে ফ্রি হয়ে যেতে পারেন।
ফুটবলে এই বিষয়গুলো অনেক সময় চোখে পড়ে না। কিন্তু মাঠে খেলা মানুষ হিসেবে আমি জানি, একজন স্ট্রাইকার বা ফরোয়ার্ডের অফ-দ্য-বল মুভমেন্ট কতটা গুরুত্বপূর্ণ। মার্তিনেজের কাজের সুফল অনেক সময় মেসি পান। কারণ ডিফেন্ডারদের মনোযোগ বিভক্ত হয়ে যায়।
ম্যাচের প্রথম গোলটি ছিল পরিকল্পিত আক্রমণের ফল। কিন্তু দ্বিতীয় গোলটি ছিল এক কথায় অসাধারণ। এমন গোলই আমাদের মনে করিয়ে দেয় কেন মেসিকে এখনো বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার বলা হয়। ৩৯ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে এমন নিয়ন্ত্রণ, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং এমন নিখুঁত সমাপ্তি সত্যিই অবিশ্বাস্য। আমরা অনেক সময় বয়স নিয়ে কথা বলি। ভাবি, একজন খেলোয়াড়ের সময় শেষ হয়ে এসেছে। কিন্তু মেসি বারবার প্রমাণ করছেন, ফুটবল শুধু গতির খেলা নয়; এটি বুদ্ধিমত্তা, অবস্থান নির্বাচন এবং মুহূর্তকে কাজে লাগানোরও খেলা। শারীরিক সক্ষমতা হয়তো আগের মতো নেই, কিন্তু তার ফুটবল মস্তিষ্ক এখনো বিশ্বের সেরাদের মধ্যে অন্যতম।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি তাই শুধু আর্জেন্টিনার জয় নয়, এটি ছিল একটি পরিণত দলের জয়। একই সঙ্গে এটি ছিল মেসির আরেকটি স্মরণীয় প্রদর্শনী। পুরো দল গুছিয়ে খেলেছে, দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত তাদের সবচেয়ে বড় তারকাকে উজ্জ্বল হওয়ার মঞ্চ তৈরি করে দিয়েছে।
৩৯ বছর বয়সেও গোলের জন্য এমন ক্ষুধা, এমন দক্ষতা এবং এমন প্রভাব এটাই মেসিকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। আমরা হয়তো তার ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ের দিকে এগোচ্ছি, কিন্তু তিনি এখনো এমন সব মুহূর্ত উপহার দিচ্ছেন যা ফুটবলপ্রেমীরা বহু বছর ধরে মনে রাখবে।
আর তাই বলতেই হয়, সময় বদলেছে, বয়স বেড়েছে, কিন্তু মেসি এখনো মেসিই। ফুটবলের ভাষায়, তিনি এখনো এক বিস্ময়ের নাম।