যা বলছে গবেষণা

দীর্ঘ জীবন পেতে প্রজাপতির অভিনব অভিযোজন

প্রকৃতির বিচিত্র জগতে প্রজাপতির জীবন সাধারণত খুবই সংক্ষিপ্ত। রঙিন ডানায় ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ানো এই প্রাণীগুলোর বেশিরভাগই পূর্ণবয়স্ক হওয়ার পর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বেঁচে থাকে। তবে মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অরণ্যে বসবাসকারী কিছু প্রজাপতি যেন সেই প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখন খুঁজে পেয়েছেন, বিশেষ এক খাদ্যাভ্যাস ও রহস্যময় জৈবিক অভিযোজনের কারণে এসব প্রজাপতি তাদের নিকটাত্মীয়দের তুলনায় প্রায় ২৫ গুণ বেশি সময় বেঁচে থাকতে পারে।

সম্প্রতি বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী নেচার কমিউনিকেশনস-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, হেলিকোনিয়াস (Heliconius) প্রজাটির কিছু প্রজাপতির আয়ু অন্য প্রজাতির তুলনায় বিস্ময়করভাবে বেশি। যেখানে ডায়োনে জুনো নামের একটি প্রজাপতি পূর্ণবয়স্ক হওয়ার পর মাত্র ১৪ দিন বাঁচে, সেখানে হেলিকোনিয়াস হিউইটসোনি প্রায় ৩৪৮ দিন পর্যন্ত জীবিত থাকতে পারে। আরও কিছু প্রজাতির আয়ু ১০৬ থেকে ২৭৭ দিনের মধ্যে।

গবেষণার প্রধান লেখক ও যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. জেসিকা ফোলির ভাষায়, প্রাণিজগতে আয়ুষ্কালের এমন বৈচিত্র্য সবসময়ই বিজ্ঞানীদের আগ্রহের বিষয়। কিছু পতঙ্গ মাত্র একদিন বাঁচে, আবার কিছু তিমি ও হাঙর শত শত বছর বেঁচে থাকে। এই পার্থক্যের পেছনের বিবর্তনীয় কারণগুলো বোঝা গেলে মানুষের সুস্থ বার্ধক্য সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

MixCollage-24-Jun-2026-04-44-PM-4300

পরাগভোজী হওয়ার ব্যতিক্রমী কৌশল

সাধারণত পূর্ণবয়স্ক প্রজাপতির প্রধান খাদ্য ফুলের মধু। এতে মূলত শর্করা থাকে, যা তাদের উড়তে ও দৈনন্দিন কার্যক্রম চালাতে শক্তি জোগায়। কিন্তু প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড ও চর্বিজাতীয় উপাদান তারা শূককীট অবস্থায় উদ্ভিদ খেয়ে সঞ্চয় করে। সেই সঞ্চিত পুষ্টি শেষ হয়ে গেলে তাদের জীবনও দ্রুত শেষ হয়ে আসে।

কিন্তু হেলিকোনিয়াস প্রজাতির অধিকাংশ প্রজাপতি একটি ব্যতিক্রমী পথ বেছে নিয়েছে। তারা শুধু মধুই নয়, ফুলের পরাগও খায়। পরাগে থাকে প্রোটিন, অ্যামিনো অ্যাসিড ও চর্বি, যা শক্তি সঞ্চয়ের পাশাপাশি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, এই অতিরিক্ত পুষ্টিই হয়তো তাদের দীর্ঘ জীবনের রহস্য।

MixCollage-24-Jun-2026-04-44-PM-5929

গবেষকরা বিষয়টি যাচাই করতে ২৮টি হেলিকোনিয়াস প্রজাতির জীবনচক্র ও খাদ্যাভ্যাস বিশ্লেষণ করেন। এর মধ্যে মাত্র ছয়টি প্রজাতি পরাগ খায় না এবং তাদের আয়ু ছিল ১৪ থেকে ৯৮ দিনের মধ্যে। তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, পরাগ সরিয়ে নেওয়ার পরও অনেক হেলিকোনিয়াস প্রজাপতি তাদের স্বাভাবিক দীর্ঘ আয়ু বজায় রেখেছে।

শুধু খাদ্য নয়, আছে বার্ধক্য প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্যও

এই ফলাফল গবেষকদের নতুন এক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। যদি শুধু পরাগই দীর্ঘ জীবনের কারণ না হয়, তাহলে এর পেছনে আর কী কাজ করছে?

উত্তর খুঁজতে গবেষকরা প্রজাপতিদের শারীরিক সক্ষমতা পরিমাপের জন্য অভিনব একটি পরীক্ষা চালান। ‘দ্য পুলিনেটর’ নামে বিশেষ এক যন্ত্রের সাহায্যে তারা বৃদ্ধ প্রজাপতিদের গ্রিপ শক্তি বা আঁকড়ে ধরার ক্ষমতা পরীক্ষা করেন। এতে দেখা যায়, হেলিকোনিয়াস হেকেলে নামের একটি দীর্ঘজীবী প্রজাতি বয়স বাড়লেও প্রায় একই রকম শারীরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে। অন্যদিকে তুলনামূলক স্বল্পায়ু ড্রায়াস ইউলিয়া প্রজাতিতে বয়সজনিত দুর্বলতার স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায়।

শুধু তাই নয়, দীর্ঘজীবী প্রজাপতিগুলো বয়স বাড়লেও তাদের শরীরের ওজন ও পেশিশক্তি দীর্ঘ সময় ধরে বজায় রাখতে সক্ষম। এমনকি পরাগ না পেলেও এই বৈশিষ্ট্যের খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।

MixCollage-24-Jun-2026-04-44-PM-4291

মানুষের বার্ধক্য গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা

গবেষকদের মতে, হেলিকোনিয়াস প্রজাপতিরা শুধু বিশেষ খাদ্যাভ্যাসই নয়, বরং দীর্ঘ জীবন ও ধীরগতির বার্ধক্য নিশ্চিত করার জন্য স্বতন্ত্র জৈবিক প্রক্রিয়াও বিবর্তনের মাধ্যমে অর্জন করেছে। তবে সেই প্রক্রিয়া ঠিক কীভাবে কাজ করে, তা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।

ড. ফোলি জানান, ভবিষ্যতে তারা এই প্রজাপতিদের দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিশক্তি ও মস্তিষ্কের কার্যকারিতাও নিয়ে গবেষণা করতে চান। কারণ বয়স বাড়লেও এসব প্রজাপতির জ্ঞানীয় সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে অটুট থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃমি, মাছি ও ইস্টের ওপর গবেষণা মানুষের বার্ধক্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। সেই তালিকায় এখন যুক্ত হতে পারে হেলিকোনিয়াস প্রজাপতি। প্রকৃতির এই ক্ষুদ্র প্রাণী হয়তো একদিন মানুষের দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনের রহস্য উন্মোচনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

প্রজাপতির ডানায় ভর করে তাই বিজ্ঞান এখন খুঁজছে দীর্ঘায়ুর নতুন সূত্র—যার উত্তর লুকিয়ে থাকতে পারে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অরণ্যের রঙিন ফুল আর তাদের পরাগরেণুর ভেতরে।

তথ্যসূত্র: সিএনএন