মার্কিন কংগ্রেসের তীব্র আপত্তির মুখেও ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে বিশাল অঙ্কের অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে মরিয়া প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধের জরুরি প্রয়োজন মেটানোর নামে হোয়াইট হাউস আইনপ্রণেতাদের কাছে ৮৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের বিশাল বাজেট বরাদ্দ চেয়ে আনুষ্ঠানিক আবেদন জানিয়েছে। এর মাত্র একদিন আগেই মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষে ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে।
বুধবার (২৪ জুন) হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের স্পিকার মাইক জনসনের কাছে হোয়াইট হাউসের ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড বাজেট অফিস এই অর্থ বরাদ্দের আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, এই বিশাল বরাদ্দের সিংহভাগ অর্থই 'অপারেশন এপিক ফিউরি' (ওএফ) বা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জরুরি চাহিদা মেটাতে ব্যয় হবে।
বাজেট প্রস্তাবের বিশদ বিবরণ অনুযায়ী, মোট বরাদ্দের ৬৭ বিলিয়ন ডলারই সরাসরি প্রতিরক্ষা দপ্তরে যাবে। এর মধ্যে ২১ বিলিয়ন ডলার অস্ত্র ও গোলাবারুদ কেনায়, ১৭ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার সামরিক অভিযানের পরিচালন ব্যয় এবং ১২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার গোপন সামরিক প্রকল্পের জন্য রাখা হয়েছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন দূতাবাস ও কূটনৈতিক কার্যালয়গুলোর নিরাপত্তা জোরদারে ৩০০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে বেশ কিছু কূটনৈতিক স্থাপনায় হামলার প্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ইরান যুদ্ধের পাশাপাশি এই বিশাল বাজেটের একটি অংশ অন্যান্য খাতেও ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে মার্কিন কৃষকদের সহায়তায় ১১ বিলিয়ন ডলার এবং মধ্য আফ্রিকায় ইবোলা প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আসন্ন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং ভোটারদের মধ্যে ইরান যুদ্ধের অজনপ্রিয়তার কারণে ট্রাম্পের এই বাজেট প্রস্তাব কংগ্রেসের অনুমোদন পাওয়া বেশ কঠিন হবে।
এদিকে, গত সপ্তাহে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যে শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছিলেন, তা নিয়েও রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের মধ্যে তীব্র সংশয় কাজ করছে। বুধবার ক্যাপিটল হিলে ট্রাম্পের সঙ্গে সিনেট রিপাবলিকানদের এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়, যা ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত। এর আগে ট্রাম্প হঠাৎ করেই একটি আবাসন বিলের স্বাক্ষর অনুষ্ঠান বাতিল করায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
সিনেটের ওই বৈঠকে ট্রাম্প মঙ্গলবার পাস হওয়া তার যুদ্ধের ক্ষমতা সীমিত করার প্রতীকী প্রস্তাবটির তীব্র সমালোচনা করেন। মার্কিন ইতিহাসে এই প্রথম কোনো প্রেসিডেন্টকে তার সামরিক কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ দিয়ে কংগ্রেস এ ধরনের কোনো প্রস্তাব পাস করল। ট্রাম্প বিষয়টিকে ‘অর্থহীন’ এবং ‘ভুল সময়ের’ পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেছেন। এমনকি যেসব রিপাবলিকান সিনেটর এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন, তাদের তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘পরাজিত’ (লুজার) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
লুইসিয়ানার রিপাবলিকান সিনেটর বিল ক্যাসিডি জানান, বৈঠকে ট্রাম্পের সঙ্গে তার বাকবিতণ্ডা হয়েছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি প্রেসিডেন্টকে বলেছি, আমেরিকান জনগণের কাছে আপনি যুদ্ধের আসল পরিস্থিতি গোপন রেখেছেন। এই যুদ্ধ চার সপ্তাহের শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা চার মাসে গড়িয়েছে, কিন্তু আমাদের মূল লক্ষ্যগুলো এখনো অর্জিত হয়নি।’
ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে বৈঠকেও ট্রাম্প এই ভোটাভুটি নিয়ে নিজের ক্ষোভ গোপন রাখেননি। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটরা যুদ্ধে হারতে চায় কারণ তারা ‘বোকা’।
উল্লেখ্য, গত মাসে পেন্টাগনের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা জুলস হার্স্ট কংগ্রেসের প্যানেলকে জানিয়েছিলেন, যুদ্ধের পেছনে এখন পর্যন্ত ২৯ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। তবে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও আইনপ্রণেতাদের মতে, এটি যুদ্ধের প্রকৃত আর্থিক ক্ষতির খুব ছোট একটি অংশ মাত্র। প্রকৃত খরচ এর চেয়ে অনেক বেশি বলে মনে করছেন তারা। বর্তমানে ওয়াশিংটন ও তেহরান যুদ্ধবিরতি পালন করলেও, পেন্টাগন সামরিক হামলার পর নিজেদের মজুত আবারও পূর্ণ করতে এই বিশাল অর্থ চাইছে।
সূত্র: বিবিসি