একাকী কনডেম সেলে কেমন কাটছে মিন্নির দিন!

বরগুনা জেলা কারাগারের কনডেমড সেলের একমাত্র নারী আসামি মিন্নি।  তিনি বরগুনার বহুল আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলার ঘোষিত রায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামী। আলোচিত এই নারী আসামীর দিনরাত কাটছে এখন কারাগারের কনডেম সেলে। জানা গেছে, কনডেম সেলে ইবাদত বন্দেগি করেই দিন পার করছেন তিনি।

কারাবিধি অনুযায়ী, কনডেম সেলের বন্দীর দুই সেট করে পোশাক দেয়া হয়েছে। কনডেম সেলের বন্দিরা সেল থেকে বের হতে পারেন না। তবে মাসে একবার স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে পারেন। সপ্তাহে একবার নির্দিষ্ট সময় পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে পারেন।

মিন্নির ক্ষেত্রেও বাইরের কারো সঙ্গে কথা বলার তেমন একটা সুযোগ নেই। তবে তিনি কারারক্ষীদের সঙ্গেও তেমন কথা বলেন না। বাবা-মা দেখা করতে এলে তাদের সঙ্গেই তার যত কথা। এছাড়া বাকি সময় ইবাদত বন্দেগি করেই কাটে তার সময়।

কারা কর্তৃপক্ষ সূত্র জানা যায়, মিন্নির মধ্যে কোনো অস্থিরতা বা আবেগ প্রকাশ পায়নি। তিনি সব সময় চুপচাপ থাকেন। তবে তাকে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে দেখা যায়। কারাগারে তার আচার-আচরণও সন্তোষজনক। এখন পর্যন্ত কারাগারে কোনো অপরাধে জড়িত হননি তিনি।

আদালতের নথি অনুয়ায়ী, ২০১৯ সালের ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের কাছে স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির সামনেই প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় রিফাত শরীফকে। ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। পুলিশি তদন্তে খুনিদের সঙ্গে মিন্নির যোগসাজশের বিষয়টি উঠে আসে। মামলায় ২৪ জনকে আসামি করা হয়। তাদের মধ্যে রিফাতের স্ত্রী মিন্নিসহ ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১১ জনকে ১০, পাঁচ ও তিন বছরের কারাদণ্ড এবং বাকিদের খালাস দেয় আদালত।

সেই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের সাত বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ ২৬ জুন। স্বামী রিফাত শরীফকে হত্যার অভিযোগে মিন্নিকে ফাঁসির দণ্ড দেওয়া হয়। তবে মিন্নির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাবা-মা ও স্বজনদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ এবং মামলা পরিচালনার সুবিধার্থে কাশিমপুর কারাগার থেকে বরিশালে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে কারা কৃর্তপক্ষ। 

মিন্নির বাবা বরাবরই দাবি করেছে,  ষড়যন্ত্র করে তার মেয়েকে ফাঁসানো হয়েছে। 

২০১৯ সালে ২৬ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্য দিবালোকে রাম দা দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে রিফাত শরীফকে। একাধারে রিফাতকে কুপিয়ে বীরদর্পে অস্ত্র উঁচিয়ে এলাকা ত্যাগ করে হামলাকারীরা। গুরুতর আহত রিফাতকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে বিকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

রিফাত হত্যাকাণ্ডের পরপরই তাকে কুপিয়ে জখম করার ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং মুহূর্তেই তা ভাইরাল হয়। এরপর দেশ-বিদেশ থেকে প্রকাশ্যে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি জানানো হয়। ঘটনার পরদিন ২৭ জুন বরগুনা সদর থানায় ১২ জনের নামোল্লেখ এবং অজ্ঞাত ১০-১২ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন রিফাতের বাবা আব্দুল হালিম দুলাল শরীফ। ছয়দিন পর ২ জুলাই মামলার প্রধান আসামি ‘বন্ড বাহিনী’র প্রধান সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে ‘নয়ন বন্ড’ পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। এছাড়া মামলার তদন্ত করতে গিয়ে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে রিফাতের স্ত্রী ও মামলার প্রধান সাক্ষী মিন্নির যোগসাজশ পায় পুলিশ। ঘটনার ২০ দিন পর মিন্নিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

তদন্ত শেষে ২০১৯ সালের ১ অক্টোবর প্রাপ্তবয়স্ক ও অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই ভাগে ২৪ জনকে অভিযুক্ত করে বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে পুলিশ। এতে ১০ জন প্রাপ্তবয়স্ক এবং ১৪ জন অপ্রাপ্তবয়স্ককে আসামি করা হয়। এরপর ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির মধ্যে নিহত রিফাতের স্ত্রী মিন্নিকে প্রধান পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করে ছয় আসামিকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয় আদালত। বাকি চারজনকে খালাস দেওয়া হয়।

একই বছরের ২৭ অক্টোবর অপ্রাপ্তবয়স্ক ১৪ জনের ছয়জনকে ১০ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেয় শিশু আদালত। এছাড়া চারজনকে পাঁচ বছর ও একজনকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।