উপজেলা প্রকৌশলী বদলিতে‘৮-১০ লাখ টাকা দিতে হয় জায়গামতো’,অডিও ভাইরাল

বরগুনার তালতলী উপজেলার তুলাতলী-নিউপাড়া সড়ক নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে উপজেলা প্রকৌশলী মো. শাখাওয়াত হোসেনের একটি কথোপকথনের অডিও মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। অডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

অডিওতে ঠিকাদারি কাজ বিক্রি, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং বদলির ক্ষেত্রে ‘জায়গামতো ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা দিতে হয়’ এমন মন্তব্য করতে শোনাে গেছে ।

ভাইরাল অডিওতে স্থানীয় সংবাদকর্মী সোহেল রানা টিএনটি রোড থেকে নিউপাড়া সড়কের তুলাতলী-নিউপাড়া অংশটুকুর ৪ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে উপজেলা প্রকৌশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলীর কাছে তথ্য জানতে গেলে তাদের সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথন হয়। কথোপকথনে দাবি করা হয়, সড়কটির মূল ঠিকাদার আঁখি কনস্ট্রাকশনের মো. বাদলের কাজ হলেও তিনি কাজটি নয়ন মৃধার কাছে বিক্রি করেছেন। বর্তমানে নয়ন মৃধা সাব-ঠিকাদার হিসেবে কাজ পরিচালনা করছেন।

এ বিষয়ে উপসহকারী প্রকৌশলী সামসুদ্দিনকে বলতে শোনা যায়,ঐ রাস্তার ঠিকাদার নয়ন মৃধা। সে কে, তা চেনানোর দরকার নেই। সে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, খোঁজ নিলেই বুঝতে পারবেন। জবাবে সংবাদকর্মী বলেন, “আমি তথ্য নিতে এসেছি। ঠিকাদার কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, সেটা দিয়ে আমার কী হবে?

অডিওতে উপজেলা প্রকৌশলী মো.সাখাওয়াত হোসেনকে বলতে শোনা যায়, বৃষ্টির সময় মাটি ফেলার কারণে কিছু সমস্যা হয়েছে। শ্রমিকদের হাতের কাজ হওয়ায় কিছু ত্রুটি থাকতে পারে এবং এ জন্য পুরো প্রকৌশল অফিসকে দায়ী করা ঠিক হবে না। ঐ সংবাদকর্মীকে উদেশ্য করে বলেন,আপনি যে বিষয়টি ধরেছেন, সেটা ভালো ও ঠিক আছে। তবে এটার জন্য পুরো ইঞ্জিনিয়ারিং অফিস দায়ী এটাও ঠিক নয়। একপর্যায়ে ঠিকাদারি পদ্ধতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে উপজেলা প্রকৌশলী বলেন, দরপত্রে সর্বনিম্ন দর দেওয়ার পর ভ্যাট, আয়কর ও অন্যান্য ব্যয় মিটিয়ে লাভের জন্য অনেক ঠিকাদার কাজ অন্যের কাছে বিক্রি করেন। সাব-ঠিকাদারও লাভ রেখে কাজ নেন। পরে কাজ বাস্তবায়নের সময় সেই ঠিকাদার নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করতে চান। জনবল সংকটের বিষয় তুলে ধরে উপজেলা প্রকৌশলী বলেন,আমার যদি পুলিশের মতো স্ট্রাইকিং ফোর্স থাকত, তাহলে বিভিন্ন রাস্তায় লোক মোতায়েন করে রাখতাম। তাহলে রাস্তার অনিয়ম হতো না।

অডিওর শেষ অংশে নিজের বদলি প্রসঙ্গে উপজেলা প্রকৌশলীকে বলতে শোনা যায়,আমরা আপনাদের উপজেলায় সারাজীবনের জন্য আসিনি। দুই-আড়াই বছর হয়ে গেছে। বাংলাদেশে ৪৯৫টি উপজেলার মধ্যে এটি জেড ক্যাটাগরির উপজেলা। এখানে কেউ আসতে চায় না। মনপুরা ও রাঙ্গাবালীর চেয়ে একটু ভালো। কিন্তু আমি যদি জোর করে চলে যেতে চাই, তাহলে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা জায়গামতো দিয়ে যেতে হবে। এই টাকা দিয়ে কেন যাব বা বদলী?। এই বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়েছে।

স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা বলেন, তুলাতলী-নিউপাড়া সড়ক নির্মাণকাজের শুরু থেকেই বিভিন্ন অনিয়ম হচ্ছে। নির্মাণকাজে নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হচ্ছে এবং কাঁদামাটি ও বালু মিশিয়ে কাজ করা হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কের অংশবিশেষ নরম ও স্যাঁতসেঁতে হয়ে যায়। বিষয়টি আমরা একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। কিন্তু কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরে বাধ্য হয়ে বিষয়টি গণমাধ্যমকর্মীদের অবহিত করি, যাতে অনিয়মের বিষয়টি প্রকাশ পায় এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

স্থানীয় সংবাদকর্মী সোহেল রানা বলেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে খবর পাই যে তুলাতলী-নিউপাড়া সড়কে নিম্নমানের কাজ হচ্ছে। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি ব্যবহৃত ইটের মান ভালো নয় এবং সড়কের কিছু অংশ কাঁদায় পরিণত হয়েছে। বিষয়টি আমি মোবাইলে ধারণ করে ফেসবুকে লাইভ করি। এরপর তথ্য সংগ্রহের জন্য এলজিইডি কার্যালয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন। সেই কথোপকথনের একটি অংশ আমি রেকর্ড করে আমার ফেসবুক পেজে প্রকাশ করেছি। বিস্তারিত বিষয়টি ওই অডিওতেই রয়েছে।

এ বিষয়ে তালতলী উপজেলা প্রকৌশলী মো. শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ওই সংবাদকর্মী আমার কাছে তথ্য নিতে এসেছিলেন। তিনি আমার কক্ষে প্রবেশের আগেই মোবাইলে রেকর্ডিং চালু করেছিলেন। বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা শেষে তিনি স্টিমেট (প্রাক্কলন) চেয়েছিলেন। আমরা তাকে জানিয়েছিলাম, সোমবার দেওয়া হবে। এরপর তিনি চলে যান। আমি খোলামেলা কথা বলেছিলাম। কিন্তু তিনি সেসব কথোপকথন রেকর্ড করে ফেসবুকে প্রকাশ করেছেন।