কেপ ভার্দের ফুটবলে এখন ‘কোনো কিছুই অসম্ভব নয়’

একটিমাত্র মোবাইল স্ক্রিনকে ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন একঝাঁক ফুটবলার। সবার চোখে-মুখে চরম উৎকণ্ঠা, নিশ্বাস যেন বন্ধ হওয়ার উপক্রম। ফোনের ওপাশে তখন চলছে স্পেন বনাম উরুগুয়ে ম্যাচের শেষ মুহূর্তের খেলা। রেফারি শেষ বাঁশি বাজাতেই স্পেনের জয় নিশ্চিত হলো, আর সাথে সাথেই টেক্সাসের হিউস্টন স্টেডিয়ামের ড্রেসিংরুমে ফেটে পড়ল আনন্দের এক মহা বিস্ফোরণ। উন্মাদের মতো একে অপরকে জড়িয়ে ধরে নাচছেন, কাঁদছেন ফুটবলাররা। ফিফা যখন বিশ্বকাপের পরিধি বাড়িয়ে ৪৮ দলের করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তখন হয়তো ঠিক এমন একটা অলৌকিক ও আবেগী মুহূর্তেরই স্বপ্ন দেখেছিল ফুটবল বিশ্ব।

বিশ্বকাপ ইতিহাসের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম জনসংখ্যার দেশ কেপ ভার্দে ফুটবল বিশ্বকে উপহার দিল চলতি আসরের সবচেয়ে বড় রূপকথা। সৌদি আরবের বিপক্ষে ০-০ গোলে ড্র করে কোনো ম্যাচ না হেরেই গ্রুপ 'এইচ'-এর রানার্স-আপ হিসেবে বিশ্বকাপের শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে আটলান্টিক মহাসাগরের এই পুঁচকে দ্বীপরাষ্ট্রটি। আর এই অনন্য অর্জনের মাধ্যমে আগামী ৪ জুলাই মায়ামির মঞ্চে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে লড়াকু দেশটি।

ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের ৬৭ নম্বরে থাকা এই দলটির জন্য শুরু থেকেই পথটা ছিল কাঁটা বিছানো। স্পেন এবং উরুগুয়ের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের গ্রুপে পড়ে অনেকেই ভেবেছিলেন, প্রথমবার বিশ্বকাপে এসেই খড়কুটোর মতো উড়ে যাবে তারা। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে 'ব্লু শার্কস'রা দেখাল অন্য এক জেদ। নিজেদের প্রথম ম্যাচেই ইউরোপসেরা স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে রুখে দিয়ে বিশ্বকে প্রথম চমকটা দেয় তারা। এরপর একে একে তিন ম্যাচেই ড্র করে তারা প্রমাণ করেছে, বিশ্বমঞ্চে তারা কেবল সংখ্যা বাড়াতে আসেনি।

ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে নিজের দেশের জাতীয় পতাকা জড়িয়ে এসেছিলেন কোচ বুবিস্তা। গর্বে বুক ফুলিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের কাছে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। আমাদের শুরু থেকেই মূল লক্ষ্য ছিল বিশ্বের দরবারে নিজেদের দেশটাকে চেনাানো। এই মঞ্চে মেসি আর আর্জেন্টিনার বিপক্ষে খেলতে পারাটা আমাদের দেশের জন্য এক বিশাল আনন্দের এবং গর্বের উপলক্ষ।” 

পশ্চিম আফ্রিকার উপকূল থেকে দূরে অবস্থিত দ্বীপপুঞ্জটির এই সাফল্যে দেশটির হাজার হাজার মানুষ রাত জেগে রাস্তায় নেমে উৎসবে মেতেছেন। মাঠের লড়াইয়ে দুর্দান্ত খেলে ম্যাচসেরা হওয়া মিডফিল্ডার ডেরয় ডুয়ার্তে আবেগে আপ্লুত হয়ে বলেন, “সত্যি বলতে, এটা পাগলামি! আমার মনে হচ্ছে আমি কোনো স্বপ্নে আছি। ছোটবেলা থেকেই বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন দেখতাম, আর আজ সেখানে ইতিহাস গড়লাম—তা ভাবতেই পারছি না।” আর্জেন্টিনার বিপক্ষে লড়াইটা যে কঠিন, তা মেনে নিয়েও ডুয়ার্তে বলেন, “সামনে আর্জেন্টিনা, ম্যাচটা অনেক কঠিন। কিন্তু আমাদের বিশ্বাস করতে হবে। ফুটবলে যেকোনো কিছুই সম্ভব।” 

কোচ বুবিস্তা বিশ্বাস করেন, তাঁদের এই লড়াকু মনোভাব পৃথিবীর অন্যান্য ছোট ছোট দেশগুলোর জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা। ফুটবল যে শুধু অভিজাত বা পরাশক্তিদেরই আধিপত্য নয়, তা প্রমাণ করেছে কেপ ভার্দে। চরম প্রতিকূলতা ও সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে বিশ্বমঞ্চে বুক চিতিয়ে লড়াই করার এই রূপকথা ফুটবল ইতিহাসের পাতায় অনেক দিন পর্যন্ত অমলিন থাকবে।