ইসলামী ব্যাংকের এসএমই অর্থায়ন ও ভবিষ্যৎ ভাবনা

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাত। দেশের জিডিপিতে এ খাতের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই খাতের বিকাশে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি দীর্ঘদিন ধরে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। বর্তমানে এসএমই খাতে এ ব্যাংকের বিনিয়োগ প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যা দেশের মোট এসএমই বিনিয়োগের প্রায় ১০.৫ শতাংশ এবং ইসলামী ব্যাংকিং খাতের এসএমই বিনিয়োগের প্রায় ৪৩ শতাংশ। এ পর্যন্ত প্রায় ২০ লাখ উদ্যোক্তা ইসলামী ব্যাংকের অর্থায়নের সুবিধা পেয়েছেন এবং প্রায় ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এই বিনিয়োগ ভূমিকা রেখেছে।

উৎপাদনমুখী শিল্পায়নকে উৎসাহিত করাই ইসলামী ব্যাংকের এসএমই অর্থায়নের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ব্যাংকের মোট এসএমই বিনিয়োগের ৫১ শতাংশেরও বেশি, অর্থাৎ প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। পাশাপাশি করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রণোদনা ও প্রি-ফাইন্যান্স কর্মসূচি বাস্তবায়নেও ব্যাংকটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এই অর্থায়ন শুধু ব্যবসা সম্প্রসারণেই নয়, বরং নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

ইসলামী ব্যাংকের অর্থায়ন দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সম্পদের সুষম বণ্টন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়ন। এ কারণে ব্যাংকটি কৃষি, কুটির শিল্প, ক্ষুদ্র উদ্যোগ, নারী উদ্যোক্তা এবং পল্লী উন্নয়ন খাতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দেশের ৬৪ জেলার ৩৫ হাজারেরও বেশি গ্রামে প্রায় ৬,৮০০ কোটি টাকা কুটির, অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। এই প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের প্রায় ৯২ শতাংশই নারী। পাশাপাশি প্রায় ১৭ লাখ প্রান্তিক পরিবারকে ক্ষুদ্র বিনিয়োগ সুবিধা প্রদান করে ব্যাংকটি গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালীকরণ এবং আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।

এসএমই খাত দেশের রপ্তানি আয়ের নতুন সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের তাঁতশিল্প, হস্তশিল্প, মৃৎশিল্প এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে উল্লেখযোগ্য চাহিদা রয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও এখন বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন। তবে এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদন, মান সনদ অর্জন, রপ্তানি প্রশিক্ষণ এবং বাজার সংযোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন। রপ্তানিমুখী এসএমই প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ অর্থায়ন সুবিধাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক রূপান্তরে এসএমই খাতের বিকাশ অপরিহার্য। প্রযুক্তি নির্ভর, পরিবেশবান্ধব এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির মাধ্যমে এ খাতকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। ইসলামী ব্যাংক বিশ্বাস করে, শরিয়াহভিত্তিক ও কল্যাণমুখী অর্থায়নের মাধ্যমে দেশে উদ্যোক্তা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাসে এসএমই খাত ভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির যাত্রায় ইসলামী ব্যাংক এ খাতের নির্ভরযোগ্য উন্নয়ন-অংশীদার হিসেবে কাজ করে যেতে বদ্ধপরিকর।