উদ্যোক্তার সঙ্গে উন্নয়নের পথে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ (এমএসএমই) খাত এখন প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির অন্যতম চালিকাশক্তি। দেশের প্রায় ৯৯ শতাংশের বেশি অর্থনৈতিক ইউনিট এ খাতের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। জাতীয় আয় বৃদ্ধি, আঞ্চলিক শিল্পায়ন এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এমএসএমই খাত। এ খাতের সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ এবং শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ।

দেশ রূপান্তর : দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে এমএসএমই খাতের গুরুত্ব কী?

মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ : বাংলাদেশের টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হলো এমএসএমই খাত। দেশের মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের প্রায় ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ এ খাতের আওতায় রয়েছে। জাতীয় আয়ের প্রায় ৩০ শতাংশ আসে এমএসএমই খাত থেকে এবং শিল্পভিত্তিক কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ সৃষ্টি হয়েছে এই খাতের মাধ্যমে। কম মূলধনে অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখা এবং নারী ও তরুণ উদ্যোক্তা তৈরিতে এ খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের আগামী অর্থনৈতিক রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দু হবে একটি শক্তিশালী ও প্রযুক্তিনির্ভর এমএসএমই খাত।

 দেশ রূপান্তর : এসএমই খাতের জন্য শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক কী করছে?

মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ : আমরা এসএমই অর্থায়নকে শুধু বিনিয়োগ বিতরণ নয়, বরং উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির একটি কৌশলগত মাধ্যম হিসেবে দেখি। উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন প্রয়োজন বিবেচনায় সম্প্রতি ১২টি নতুন এসএমই পণ্য চালু করা হয়েছে। ২০২৫ সালে ৪ হাজার ৫৫৪ জন নতুন গ্রাহকের মধ্যে ৭৩৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার বিনিয়োগ বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৭৭ জন নারী উদ্যোক্তা পেয়েছেন ৫৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা। একই সময়ে গ্রামীণ অঞ্চলের ১ হাজার ৮০৮ জন গ্রাহককে প্রায় ৫৬০ কোটি টাকার বিনিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকের মোট বিনিয়োগের ২৬ শতাংশের বেশি এসএমই খাতে রয়েছে।

 দেশ রূপান্তর : বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকগুলোর কী ধরনের ভূমিকা রাখা উচিত?

মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ : বর্তমান সময়ে উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ও কম খরচে অর্থায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নমনীয় কিস্তি ব্যবস্থা, পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা এবং উদ্যোক্তাবান্ধব মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা জরুরি। শুধু অর্থায়ন নয়, উদ্যোক্তাদের আর্থিক সচেতনতা বৃদ্ধি, ব্যবসায়িক পরামর্শ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বাজারসংযোগ তৈরিতেও ব্যাংকগুলোর সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। বিশেষ করে নারী ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা সময়ের দাবি।

 দেশ রূপান্তর : নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ কোনো কর্মসূচি রয়েছে কি?

মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ : নারী ও তরুণ উদ্যোক্তারা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম শক্তি। তাই তাদের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন, দ্রুত সেবা এবং সক্ষমতা উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ‘প্রত্যয়ী’ ও ‘প্রথম উদ্যোগ’ নামে দুটি বিশেষ বিনিয়োগ সুবিধার মাধ্যমে নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি তাদের জন্য পৃথক সেবা ডেস্ক, প্রশিক্ষণ এবং আর্থিক সচেতনতা কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে।

 দেশ রূপান্তর : প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা এসএমই খাতকে কীভাবে সহায়তা করছে?

মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ : প্রযুক্তির ব্যবহারে এসএমই অর্থায়ন আরও সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ হয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে উদ্যোক্তারা সহজে ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করতে পারছেন। বিনিয়োগ অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত করতে আমরা ‘ডিজিটাল ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ চালু করেছি। এছাড়া ‘শাহজালাল টাচ পে’-এর মাধ্যমে গ্রাহকরা ঘরে বসেই বিভিন্ন লেনদেন ও বিল পরিশোধ করতে পারছেন। এসব উদ্যোগ উদ্যোক্তাদের সময় ও খরচ কমিয়ে ব্যবসার গতি বাড়াচ্ছে।

 দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল বাস্তবায়নে আপনারা কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছেন?

মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ : বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে আমরা সক্রিয়ভাবে কাজ করছি। ইতিমধ্যে ১২টি পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের আওতায় সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। এসব তহবিলের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ৬ হাজার ৮১৮ জন গ্রাহক সুবিধা পেয়েছেন। উৎপাদনমুখী ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দিয়ে অর্থায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

 দেশ রূপান্তর : এমএসএমই খাতের বড় চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় কী ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন?

মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ : জামানত সংকট, উচ্চ অর্থায়ন ব্যয় এবং বাজারে প্রবেশের সীমাবদ্ধতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এসব সমস্যা সমাধানে ব্যবসার নগদ প্রবাহ ও সক্ষমতার ভিত্তিতে অর্থায়ন বাড়াতে হবে। ঋণ গ্যারান্টি কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করা, বিকল্প তথ্যভিত্তিক ঋণ মূল্যায়ন চালু করা এবং উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ইতিমধ্যে ‘প্রাপ্তি’ নামে জামানতবিহীন অর্থায়ন সুবিধা চালু করেছে। আমরা মনে করি, সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এমএসএমই খাত দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও গতিশীল করতে সক্ষম হবে।