বেশিরভাগ উদ্যোক্তাই সরকারি সেবার বাইরে

উন্নত, উন্নয়নশীল ও অনুন্নত সব দেশের অর্থনীতির জন্য কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এসএমই খাত দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার পাশাপাশি শ্রম খাতে ৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে।

সরকারের পরিসংখ্যান অনুসারে, দেশের ১ কোটি ১৭ লাখের বেশি সিএমএসএমই উদ্যোক্তার ৭০ শতাংশই ঢাকার বাইরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এ খাতে উদ্যোক্তাদের নীতি সহায়তা দেয় এসএমই ফাউন্ডেশন। তবে ঢাকার বাইরে সংস্থাটির কোনো কার্যালয় না থাকায় বেশিরভাগ উদ্যোক্তাই থাকছেন সরকারি এ সেবার বাইরে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, উদ্যোক্তারা ব্যবসায় এলেও তাদের বেশিরভাগ  সরকারের নীতিসহায়তার অভাবে টেকসই হতে পারছেন না। প্রতিনিয়তই ব্যবসায় লোকসান হচ্ছে। আর তারা ঋণের জালে আবদ্ধ হচ্ছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাগুলোর মধ্যে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর সমন্বয় এবং একটি শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা না হলে এসএমই খাতের সুফল পাওয়া যাবে না। 

শিল্প, বাণিজ্য এবং পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘এসএমই যত সম্প্রসারিত হবে, অর্থনীতিতে রক্ত সঞ্চালন তত বেশি হবে।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১ কোটি ১৭ লাখ অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে ৩৪ শতাংশই হচ্ছে এমএসএমই, এমন তথ্য দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘যদিও আমরা এখনো বৈশ্বিক স্ট্যান্ডার্ডের নিচে, দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে প্রাণোদ্দীপ্ত করতে হলে এমএসএমই খাত শক্তিশালী করতে হবে।’

দেশে বর্তমান মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ক্ষেত্রে এসএমই খাতের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ। তবে প্রতিবেশীসহ আশপাশের দেশের তুলনায় এখানে এ খাত জিডিপিতে অবদানে অনেক পিছিয়ে আছে। এসএমই খাত চীনের জিডিপিতে ৬০ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৫২ শতাংশ, জাপানে ৫০ শতাংশ, ভিয়েতনামে ৪৫ শতাংশ, পাকিস্তানে ৪০ শতাংশ এবং ভারতে ৩৭ শতাংশ আবদান রাখে।

মন্ত্রী বলেন, এসএমই খাতের সম্প্রসারণে বিসিক শিল্পপার্ক নতুন করে সাজানো হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অনেক বড় ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বিদেশে টাকা পাচার ও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি হয়, এমন অভিযোগ থাকলেও সাধারণ বা তুলনামূলক ছোট ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগ ঋণের প্রায় শতভাগ ফেরত দিচ্ছে। এসএমই উদ্যোক্তাদের বড় অংশই নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করেন। এ কারণে, এই খাতে খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি করপোরেট ঋণের তুলনায় অনেক কম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩২ শতাংশ। যা করপোরেট পর্যায়ে আটকা পড়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৩ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুসারে দেশে তখন সিএমএসএমই উদ্যোক্তা ছিলেন ৭৮ লাখ ১৩ হাজারের বেশি। ২০২৪ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষার প্রাথমিক রিপোর্ট অনুসারে দেশে বর্তমানে এমন উদ্যোক্তা ১ কোটি ১৭ লাখ। এ খাতে কর্মরত জনবল ৩ কোটির বেশি। এ কারণে বিশ্লেষকরা মনে করেন, দেশের দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়ন ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য এসএমই খাতকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি। যা দেশের বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানে বিশেষ অবদান রাখবে। এর মাধ্যমে সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সহজ হবে।

বর্তমানে দেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখের বেশি, যার মধ্যে প্রায় ৯ লাখ স্নাতক ডিগ্রিধারী উচ্চশিক্ষিত বেকার রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২২ শতাংশ তরুণ-তরুণী কোনো প্রকার শিক্ষা, চাকরি ও প্রশিক্ষণে সম্পৃক্ত নয়। এ বিশাল সংখ্যক বেকারের অধিকাংশই ১৫-২৯ বছর বয়সের।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, সরকার আগামী অর্থবছরে ১২ লাখ কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে এসএমই খাতের বিকাশে সহজ শর্তে ঋণ বিতরণের জন্য ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আগামী অর্থবছরে হাই-টেক পার্কে ১৫ হাজার জনের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের এসআইসিআিইপি প্রোগ্রামের (স্কিলস ফর ইন্ডাস্ট্রি কম্পিটিটিভনেস অ্যান্ড ইনোভেশন প্রোগ্রাম) আওতায় ২ লাখ ২০ হাজার জনকে উচ্চতর দক্ষতার প্রশিক্ষণ প্রদান, অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির মাধ্যমে ৩ লাখ ৭০ হাজার গ্রামীণ শ্রমিকের কর্মসংস্থান, ফ্রিল্যান্সিং ও অনলাইন মার্কেটিং-এ প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তা প্রদান, গ্রামীণ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দের মাধ্যমে ৪৫ হাজার নারীর কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি খাতে প্রতি বছর দুই লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ, বিভিন্ন ধরনের কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ৫ লাখ ৫০ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করেছে সরকার।

সরকার বলছে, ধারাবাহিকভাবে দেশের অর্থনীতির সার্বিক সংস্কার, খাত ও অঞ্চলভিত্তিক অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা এবং শিল্প-বাণিজ্যে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়িয়ে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেছেন, সরকারের উন্নয়ন যাত্রা কেবল শহরকেন্দ্রিক নয়; প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যেমন গ্রামের নিরক্ষর ব্যক্তি, গৃহিণী, প্রবীণ ও দীর্ঘমেয়াদি বেকারদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসংস্থান কার্যক্রম চালুর মাধ্যমে হাঁস-মুরগি-পশুপালন, হস্তশিল্প, কুটিরশিল্প, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও ডিজিটাল দক্ষতা প্রশিক্ষণসহ সুলভে ক্ষুদ্রঋণ ও সরঞ্জাম সহায়তা প্রদান করা হবে। দেশের অর্থনীতিতে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের অবদানের গুরুত্ব বিবেচনায় এ খাতে নিয়োজিত সবার জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও যৌক্তিক মজুরি নিশ্চিত করা হবে।  

অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের কৃষি খাত, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, এসএমই শিল্প এবং রুগ্ণ ও বন্ধ কলকারখানাসমূহের জন্য সহজ শর্তে এবং পুনর্ভরণ পদ্ধতিতে ঋণ প্রদানের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এ প্যাকেজে ৪১ হাজার কোটি টাকা রিফাইন্যান্সিং তহবিল এবং ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল। এ তহবিলে সিএমএসএমই খাতের  জন্য আছে ৫ হাজার কোটি টাকা। 

অর্থমন্ত্রী বাজেট উপস্থাপনের সময় এসএমই খাতের বিকাশের জন্য পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় ইডকল, বিআইএফএফএল এবং এসএমই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সহজ শর্তে ঋণ বিতরণের জন্য ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেন।

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের নীতি সহায়তা প্রদানকারী এসএমই ফাউন্ডেশন সূত্র জানায়, ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ফাউন্ডেশন এ যাবৎ প্রায় ১৩ হাজার উদ্যোক্তার মধ্যে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ দিয়েছে। যার মধ্যে ২৫ শতাংশ সুবিধাভোগী নারী উদ্যোক্তা। এসএমই ফাউন্ডেশন এখন পর্যন্ত ২৪টি দেশি-বিদেশি, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে এবং যৌথভাবে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সারা দেশে ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন কর্মসূচির সুবিধাভোগী প্রায় ২২ লাখ সিএমএসএমই উদ্যোক্তা।

ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য ২০১৯ সালে এসএমই নীতিমালা  প্রণয়ন করা হলেও তহবিল সংকটের কারণে তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। নতুন করে এসএমই নীতিমালা-২০২৬ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারা মনে করেন, নতুন নীতিমালা বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করা দরকার। এ খাতে প্রচলিত অর্থায়নের পাশাপাশি ক্রেডিট গ্যারান্টি, মুভেবল অ্যাসেট ফাইন্যান্স, ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্স এবং বীমাভিত্তিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মতো উদ্ভাবনী আর্থিক উপকরণ চালুর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। সব মিলিয়ে ভালো ফল পেতে হলে এ খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব ও সমন্বয় প্রয়োজন।