এসএমই খাত দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে এ খাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এসএমই দিবস-২০২৬ উপলক্ষে দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সোনালী ব্যাংক পিএলসি’র এসএমই অর্থায়ন, নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের সহায়তা, গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. শওকত আলী খান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক নাজমুল ইসলাম।

দেশ রূপান্তর : দেশের অর্থনীতিতে এসএমই খাতের বর্তমান অবস্থান কীভাবে দেখছেন?

মো. শওকত আলী খান : দেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতকে অর্থনীতির ‘চালিকাশক্তি’ বা লাইফলাইন হিসেবে দেখা হয়। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে এ খাতের অবদান অনস্বীকার্য। বর্তমানে দেশের মোট শিল্প-কারখানার সিংহভাগই এসএমই খাতের অন্তর্ভুক্ত। অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানিতেও এ খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দেশে লক্ষাধিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেছে। পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়ছে এবং তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তশিল্প ও ই-কমার্সসহ বিভিন্ন খাতে এসএমই বিস্তৃত হচ্ছে।

দেশ রূপান্তর : সোনালী ব্যাংকের এসএমই অর্থায়নের বর্তমান চিত্র কী?

মো. শওকত আলী খান : রাষ্ট্রায়ত্ত বৃহত্তম ব্যাংক হিসেবে সোনালী ব্যাংক দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত এসএমই অর্থায়নে গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী উৎপাদনশীল খাত, কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায় সহজ শর্তে ঋণ বিতরণ জোরদার করা হয়েছে। আমাদের মোট ঋণ পোর্টফোলিওতে এসএমই খাতের অংশীদারিত্ব ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ব্যাংকের এসএমই ঋণের স্থিতি প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণ ও অগ্রিমের প্রায় ১৬ শতাংশ।

দেশ রূপান্তর : জামানত ছাড়া বা কম জামানতে ঋণ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

মো. শওকত আলী খান : অবশ্যই। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প এবং বিশেষ করে নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম (সিজিএস)-এর আওতায় জামানতবিহীন ঋণের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে নারী উদ্যোক্তারা ২৫ লাখ টাকা এবং পুরুষ উদ্যোক্তারা ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানত ছাড়াই ঋণ পেতে পারেন। এ ছাড়া ব্যক্তিগত গ্যারান্টি বা ব্যবসার নগদ প্রবাহের ভিত্তিতে কম জামানতে ঋণ প্রদানের প্রক্রিয়া আরও সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

দেশ রূপান্তর : নারী উদ্যোক্তাদের জন্য কী বিশেষ সুবিধা রয়েছে?

মো. শওকত আলী খান : নারী উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক মূলধারায় যুক্ত করতে আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। তাদের জন্য তুলনামূলক কম এবং একক অঙ্কের সুদে ঋণের ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি জামানতবিহীন ঋণ, সহজ শর্তে ঋণ প্রক্রিয়াকরণ এবং বিশেষ ওয়ান-স্টপ সার্ভিস ডেস্কের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। ২০২৬ সালে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সিএমএসএমই খাতে ৮০৭ কোটি টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে মে মাস পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে ২৫৭ কোটি টাকা এবং এ খাতে ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা।

দেশ রূপান্তর : তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকের বিশেষ কোনো কর্মসূচি রয়েছে?

মো. শওকত আলী খান : নতুন ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ স্টার্টআপ ফান্ড এবং পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা রয়েছে। কোনো উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক ধারণা ও সম্ভাবনাময় ব্যবসায় পরিকল্পনা থাকলে সহজ শর্তে মূলধন সহায়তা দেওয়া হয়। এ ছাড়া উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বাড়াতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিও পরিচালনা করা হচ্ছে।

দেশ রূপান্তর : এসএমই ঋণের খেলাপি পরিস্থিতি কেমন?

মো. শওকত আলী খান : করপোরেট ঋণের তুলনায় এসএমই খাতে ঋণ আদায়ের হার তুলনামূলকভাবে ভালো। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা নিয়মিত কিস্তি পরিশোধে সচেষ্ট থাকেন। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বা ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণে কিছু ঋণ খেলাপি হলেও কঠোর তদারকি ও নিয়মিত পরামর্শ কার্যক্রমের মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

দেশ রূপান্তর : গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?

মো. শওকত আলী খান : গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করতে আমাদের পল্লী শাখাগুলোর মাধ্যমে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কুটির শিল্প, তাঁত শিল্প, মৎস্য ও পশুপালন খাতে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া এজেন্ট ব্যাংকিং ও উপশাখার মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের দোরগোড়ায় এসএমই ঋণসেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত সহায়তা কতটা কার্যকর?

মো. শওকত আলী খান : বাংলাদেশ ব্যাংকের রিফাইন্যান্সিং স্কিম, ক্রেডিট গ্যারান্টি সুবিধা এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ তহবিল অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। এসব উদ্যোগের ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কম সুদে এবং তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন করতে পারছে, যা সামগ্রিকভাবে এসএমই খাতকে আরও শক্তিশালী করছে।

দেশ রূপান্তর : নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

মো. শওকত আলী খান : ব্যবসা শুরু করার আগে অবশ্যই বাজার যাচাই এবং একটি বাস্তবসম্মত ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। সঠিক হিসাব সংরক্ষণ, ট্রেড লাইসেন্সসহ প্রয়োজনীয় আইনগত কাগজপত্র হালনাগাদ রাখা জরুরি। পাশাপাশি শুধু ঋণের ওপর নির্ভর না করে নিজের দক্ষতা, উদ্ভাবনী চিন্তা ও পরিশ্রমকে কাজে লাগাতে হবে।

দেশ রূপান্তর : এসএমই দিবস-২০২৬ উপলক্ষে উদ্যোক্তাদের জন্য আপনার বার্তা কী?

মো. শওকত আলী খান : এসএমই দিবস-২০২৬ উপলক্ষে দেশের সব সাহসী, পরিশ্রমী ও উদ্যমী উদ্যোক্তাকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই। আপনারাই দেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি। যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সোনালী ব্যাংক আপনাদের পাশে থাকবে। সততা, কঠোর পরিশ্রম এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে আপনারা নিজেদের ব্যবসাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবেন, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।