নীল রাজা-রানীর গল্প

স্বর্গীয় পাখি দুধরাজ বা সাহেব বুলবুলির ছবি তোলার জন্য সেই সকাল থেকে ক্যামেরা হাতে আমবাগানে ঘোরাঘুরি করছি। কিন্তু কোনোভাবেই পাখিটির দেখা পাচ্ছি না। গত রাতে প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি হয়েছে। মাটিতে প্রচুর আম পড়ে আছে। বাগানের জায়গায় জায়গায় এখনো বৃষ্টির পানি জমে আছে। কোন কোন জায়গা বেশ পিচ্ছিল। তাই সাবধানে হাঁটতে হচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় পাশের বাঁশবাগানের সামনে চলে এলাম। তখন সকাল ৯টা ১০ মিনিট। হঠাৎই বাঁশঝাড়ে কিছু একটাকে নড়াচড়া করতে দেখে ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রাখলাম। আর চোখের সামনে ছোট্ট কালো-টুপি ও নীল দেহের একটি পাখির অবয়ব ভেসে উঠল। সঙ্গে সঙ্গেই পাখিটিকে চিনে ফেললাম। আর দ্রুত শাটারে ক্লিক করলাম। ওর ছবি তুলে আবারও দুধরাজ পাখি খুঁজতে আমবাগানে ঢুকতেই একটি বাচ্চা পাখির কান্নার শব্দ শুনলাম। ছানাটি সদ্য ওড়াউড়ি শিখেছে। ছানাটিকে দেখেই বুঝতে পারলাম আশপাশে ওর বাবা-মা আছে এবং এ কথা চিন্তা করতে করতেই খাবার মুখে মা পাখিটিকে উড়ে এসে ছানাটির পাশে বসতে দেখলাম। আর ছানাটিও মুখ হা করে মায়ের ঠোঁটে ঠোঁট লাগাল। মাও ওর মুখের খাবার ছানাটির মুখে উগরে দিল। চমৎকার এক দৃশ্য!

পাখিগুলোকে দেখছি সেই ছেলেবেলা থেকেই। ওদের প্রথম ছবি তুলি ১৯৯৮ সালে বাগেরহাটের ফকিরহাট থেকে। ওদের যেমন পাহাড়ি বনে দেখেছি, তেমনি দেখেছি গ্রামীণ বন-বাগানে। পুরুষ নীল পাখিটির মাথার ছোট্ট কালো টুপিটি যেন রাজমুুকুট! স্ত্রী পাখিতে নীলের চেয়ে ধূসর রঙের আধিক্যই বেশি। ছানাকে খাওয়ানোর খানিক পরে স্ত্রী পাখিটিকে তার লেজের আটটি পালক মেলে ধরে লেজ নাচাতে দেখা গেল। ঘটনার আকস্মিকতায় তাজ্জব বনে গেলাম। ঘটনাটি ২ মে ২০১৮ সালের, রাজশাহীর পবা উপজেলার বায়া গ্রামের।

ছানাসহ নীল রঙের এই পাখিগুলো আর কেউ নয়, এ দেশের সচরাচর দৃশ্যমান আবাসিক পাখি নীল রাজা ও নীল রানী। অন্তত গ্রামগঞ্জে ওরা এ নামেই বেশি পরিচিত। তবে ছোট লেজ নাচুনে বা মালাটুনিও নামেও ডাকা হয়। ইংরেজি নাম ইষধপশ-হধঢ়বফ গড়হধৎপয। মোনার্কিডি (গড়হধৎপযরফধব) গোত্রের ছোট্ট এই পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম ঐুঢ়ড়ঃযুসরং ধুঁৎবধ (হাইপোথাইমিস অ্যাজুরা)। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দেখা যায়।

আকারে নীল রাজা-রানী ১৬ সেন্টিমিটার, আর ওজনে মাত্র ১২ গ্রাম। স্ত্রী ও পুরুষের চেহারা ভিন্ন। পুরুষটির গলায় যেন চকচকে ভেলভেটের মতো নীলচে-কালো মালা! মাথায় একই রঙের ছোট্ট টুপি। পেট সাদা। বুক, গলা, পিঠ ও লেজের উপরটা চকচকে নীলাভ-কালো। ঠোঁট ধূসরাভ-নীল যার অগ্রভাগ কালচে। পা ও পায়ের পাতা শ্লেট-নীল। স্ত্রীর দেহ ধূসর-বাদামি। মাথা অনুজ্জ্বল নীল। গলা ও বুক নীল-ধূসর। পেট ও পায়ুর নিচ ছাই-নীল। ঠোঁট কালচে-বাদামি যার অগ্রভাগ কালচে। পা ও পায়ের পাতা ধূসর-বাদামি। উভয়েরই চোখ বাদামি।

নীল রাজা-রানী সারা দেশের বন, বাগান ও গাছপালাপূর্ণ গ্রামাঞ্চলে বিচরণ করে। ছায়াঘেরা বাগান বেশি পছন্দ। সচরাচর একাকী বা জোড়ায় দেখা যায়। গাছের ডাল থেকে ডালে উড়ে উড়ন্ত মথ, প্রজাপতি ও অন্যান্য কীটপতঙ্গ শিকার করে খায়। পাখি ছোট হলে কী হবে গলায় বড় তেজ, তীব্র কণ্ঠে ‘হুইচ্ -- হুইচ ---’ স্বরে ডাকে। এদের ডাকের সঙ্গে দুধরাজের ডাকের বেশ মিল রয়েছে। আর সাহসও দুধরাজের মতো বেশি। এদের বাসার আশপাশে অন্য পাখি, মানুষ, গুইসাপ, কুকুর-বিড়াল বা অন্য পশু দেখলে তেড়ে আসে। দেখা গেল হয়তো একটি কুকুর এদের বাসার নিচে এসে দাঁড়িয়েছে, তখন হঠাৎ করেই স্ত্রী-পুরুষ একসঙ্গে দুদিক থেকে এসে একজন কুকুরের ঘাড়ে ও আরেকজন লেজে আক্রমণ করবে। হতবিহ্বল কুকুরের তখন ঘটনার আকস্মিকতায় ভোঁ দৌড় দেওয়া ছাড়া আর কোনে উপায় থাকবে না। রেগে গেলে এদের চোখ লাল হয়ে যায়।

মার্চ থেকে আগস্ট প্রজননকাল। এ সময় মাটি থেকে ৪-৫ মিটার উচ্চতায় গাছের খাড়া সরু বা দ্বিধাবিভক্ত ডালে সরু ঘাস, লতা, শিকড়, মস, গাছের বাকল ইত্যাদি দিয়ে চায়ের কাপের মতো বাসা বানায়। বাসার বাইরের দিকটা মাকড়সার জাল-ডিম দিয়ে সাজায়। বাসা বানানো হলে স্ত্রী তাতে ৩-৪টি সাদাটে ডিম পাড়ে। ডিম ফোটে ১২-১৫ দিনে। বাসা বানানো, ডিমে তা দেওয়া, ছানাদের খাওয়ানো ও লালন-পালন প্রভৃতি সব কাজ রাজা-রানী মিলেই করে। তবে, পুরুষটি বাসা-ছানা পাহারায় বেশ তৎপর থাকে। ছানারা ১৯-২৩ দিনে উড়তে শিখে। পরের বছরই প্রজননক্ষম হয় ও ডিম-ছানা তোলে। আয়ুষ্কাল ৪-৫ বছর।

লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ