আত্মসমর্পণের আড়ালে সুরক্ষিত সাম্রাজ্য!

২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে ‘পুলিশের ক্রসফায়ারে’ সারা দেশে তখন ৩শরও বেশি লোক মারা যায়। ইয়াবা চোরাচালানের প্রধান রুট হিসেবে বিবেচিত কক্সবাজারেই মারা যায় ৫৩ জন। তখন প্রশাসনের সহায়তায় ঘটা করে ২০১৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজারে আত্মসমর্পণ করে শীর্ষ ১০২ জন মাদক কারবারি। কিন্তু কয়েক মাস কারাবাস করে জামিনে বের হয়ে আবার মাদক কারবারে যুক্ত হন তারা। পুলিশ সংশ্লিষ্টদের মতে, আসলে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে শীর্ষ মাদক কারবারিরা তখন ক্রসফায়ার থেকে নিজেদের জীবন বাঁচিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা প্রশাসনের সুরক্ষায় ছিল। অন্যদিকে তাদের সাম্রাজ্যও অক্ষুণœ ছিল।

তারা এসেছিলেন বুক ফুলিয়ে, ফিরেও গেছেন সদর্পে। দেশের মাদক চোরাচালানের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ‘আত্মসমর্পণ’ পরও তাদের সাম্রাজ্যের এতটুকু নড়চড় হয়নি কোটিপতি মাদক কারবারিদের। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখধাঁধানো অভিযানের মুখে পকেটে ‘ক্লিনচিট’ আর আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে এখনো তারা বহাল তবিয়তে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় তাদের অর্জিত হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে নেওয়া হয়নি। এই নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি আব্দুল রহমান বদির আপন তিন ভাইসহ ঘনিষ্ঠ আটজন আত্মীয়ও ছিলেন। তাদের সবার সম্পদ ক্রোক করতে আদালতের আদেশ থাকলেও তার বাস্তবায়ন হযনি। আর বদি কারাগারে থাকলেও দমে যাননি। 

আদালতের নির্দেশে কিছু সম্পদ ‘ক্রোক’ করা হলেও বাস্তবে ওই সম্পদ কারবারি ও তাদের পরিবারের হাতেই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। বিশেষ করে টেকনাফ ও সীমান্ত অঞ্চলের ইয়াবা সম্রাটদের সম্পদের পাহাড় দিন দিন আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে। সরেজমিন ও পুলিশের একটি গোপন প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে এসব কল্পকাহিনির তথ্য। আগের মতোই চলছে তাদের মাদক কারবার।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাদকবিরোধী অভিযানে বড় বড় কারবারিরা সাময়িক গা-ঢাকা দিলেও বা তথাকথিত আত্মসমর্পণ করলেও তাদের বিপুল অবৈধ অর্থ-সম্পদে প্রশাসনের কোনো হাত পড়েনি। কক্সবাজার-টেকনাফে তালিকাভুক্ত ১১৭ মাদক কারবারির অঢেল সহায়-সম্পদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তৎকালীন প্রশাসনের। কক্সবাজার জেলা পুলিশ ২০১৯ সালে কারবারিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে পুলিশ সদর দপ্তরের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ে আবেদনও করেছিল। তার মধ্যে সাবেক এমপি বদি, তার চারভাই ও অন্যান্য স্বজন এবং বন্দুকযুদ্ধে নিহত সাইফুল করিমসহ ৫০ ‘মাদক সম্রাটের’ সম্পদের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। একেকজনের নামে-বেনামে শত কোটি টাকারও সম্পদ আছে বলে পুলিশের তথ্য বলছে। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনও এই নিয়ে কাজ করেছে। কিন্তু দুদকের অনুসন্ধান আওয়ামী লীগ আমল থেকে এখনো বন্ধ আছে। ২০২০ সালে কারবারিদের সম্পদ সরকারি কোষাগারে নিতে চাইলেও সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সবুজ সংকেত পায়নি পুলিশ সদর দপ্তর। বর্তমানেও একই অবস্থা বিরাজ করছে।

শান্তিতে ঘুমাতে পারবে না কারবারিরা : পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির দেশ রূপান্তরকে বলেন, মাদক কারবারিরা শান্তিতে ঘুমাতে পারবে না। ইতিমধ্যে পুলিশের সবকটি ইউনিট প্রধানদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তাদের বিষয়ে। কোটিপতি কারবারিদের ধরতে পুলিশ বেশি কাজ করছে। কক্সবাজার ও টেকনাফে বিশেষ নজরদারি করা হচ্ছে। যেভাবেই হোক দেশ থেকে মাদক নির্মূল করা হবে। 

আত্মসমর্পণ নাটক : প্রায় সাত বছর আগে কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েক দফায় শীর্ষ মাদক কারবারিরা ঘটা করে আত্মসমর্পণ করেন। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এই আত্মসমর্পণকে মাদক নির্মূলের ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। নাম প্রকাশ না করে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আত্মসমর্পণের পর কিছুদিন কারাগারে বিলাসী জীবনযাপনের পর তারা জামিনে বেরিয়ে আসেন এবং মাদক কারবার চালিয়ে যান। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কারাগারের ভেতরে বসেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে মাদক সাম্রাজ্য ও হুন্ডি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করার তথ্যও মিলেছে। অট্টালিকায় তারা পরিবারসহ বসবাস করছেন। কিন্তু তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত না করায় এবং তাদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মানিলন্ডারিং মামলাগুলো ঝুলে থাকায় আবার তারা এই কারবারে যুক্ত হয়েছেন। আসলে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে তারা তখন ক্রসফায়ার থেকে নিজেদের জীবন বাঁচিয়েছেন। এর মাধ্যমে তারা প্রশাসনের সুরক্ষায় ছিলেন। অন্যদিকে তাদের সাম্রাজ্যও অক্ষুণœ ছিল।

বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের পরিকল্পনা : স্বরাষ্ট্র ও পুলিশ সদর দপ্তরের দুই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, কারকারিদের নিয়ন্ত্রণ করতে হলে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা জরুরি হয়ে পড়ছে। এজন্য মন্ত্রণালয় আগামী তিন মাসের মধ্যে টাস্কফোর্স গঠন করে কার্যক্রম শুরু করবে। মাদক কারবারিদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং তা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য সিআইডি, এনবিআর, ডিএনসি ও দুদকের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী ‘সম্পদ পুনরুদ্ধার ও ব্যবস্থাপনা’ কমিটি গঠনেও কাজ চলছে। কোটিপতি কারবারিদের সম্পদের পাহাড়ে হাত না দিলে এবং তা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে এনে জনকল্যাণে ব্যয় না করলে, এই বিষাক্ত চক্র কোনোদিনই ভাঙা সম্ভব হবে না। ওই দুই কর্মকর্তা আরও বলেন, মানিলন্ডারিং ও মাদক মামলাগুলোর জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে সর্বোচ্চ ৬ মাসের মধ্যে বিচারকাজ শেষ করতে হবে, যাতে অপরাধীরা দীর্ঘ সময় ধরে জামিনের সুযোগ না পান। টেকনাফ ও নাফ নদ সীমান্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়াতে আধুনিক ড্রোন এবং থার্মাল ইমেজিং প্রযুক্তির ব্যবহারের চিন্তা করা হচ্ছে।

মাফিয়াদের তালিকা : পুলিশ জানায়, শীর্ষ ১১৭ কারবারির মধ্যে অন্তত ৫০ জনের ইয়াবা সম্রাটের শত কোটি টাকার সম্পদ আছে। তারা হলেন হাজি সাইফুল করিম, আলিয়াবাদের সাবেক এমপি বদির ছোট ভাই আবদুস শুক্কুর, একই এলাকার আমিনুর রহমান, পশ্চিম লেদারের নুরুল হুদা মেম্বার ও নুরুল কবির, উত্তর লেঙ্গুর বিলের দিদার মিয়া, মুন্ডারডেইলের শাহেদ রহমান নিপু ও সাকের মিয়া, ডেইলপাড়ার আবদুল আমিন ও নুরুল আমিন, চৌধুরীপাড়ার শফিকুল ইসলাম ওরফে শফিক ও ফয়সাল রহমান, নাজিরপাড়ার এনাম মেম্বার ও মো. আফসার, মৌলভীপাড়ার একরাম হোসেন, আবদুল গনি ও মোহাম্মদ আলী, নাজিরপাড়ার সৈয়দ হোসেন, জামাল হোসেন ও নুরুল আলম, আলিরডেইলের শাহেদ কামাল, সাবরাংয়ের মৌলভী বছির আহম্মদ, গোদারবিলের আবদুর রহমান ও জিহাদ, হ্ণীলাপাড়া বাজারের মোহাম্মদ শাহ, আলীখালির জামাল মেম্বার, জাদিমুরার হাসান আবদুল্লাহ, উত্তরপাড়ার রেজাউল করিম, পূর্ব লেদারের ফরিদ আলম ও জাহাঙ্গীর আলম, নীলা পশ্চিমপাড়ার মাহবুব আলম, নাইটাংপাড়ার হাবিবুর রহমান, পানছুড়িপাড়ার শামসুল আলম ওরফে সামসু মেম্বার, পুরাতন কল্যাণপাড়ার মোহাম্মদ ইসমাইল, কুচবুনিয়াপাড়ার আবদুল হামিদ, ঝিনাপাড়ার আলী আহম্মেদ, দক্ষিণ নয়াপাড়ার আলমগীর ফয়সাল, শাহপরীর দ্বীপের সামসুল আলম, মিঠাপানির ছড়ার ইফনুছ, পশ্চিম পানখালীর নুরুল আফসার প্রমুখ।

এ ছাড়া সাবেক সাংসদ আবদুর রহমান বদির ভাই মুজিবুর রহমান ও আ. শুক্কুরের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করে দুদক। শুক্কুরের ৮ কোটি টাকার ও মজিবুর রহমানের এক কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পেয়েছে দুদক। হাজি সাইফুল করিমের ১১ কোটি টাকার বেশি সম্পদ আছে। সাইফুল করিমের ভাই রিয়া করিম ও ভগ্নিপতি সাইফুল ইসলামও বিপুল অর্থ সম্পদের মালিক। হ্নীলা ইউনিয়নের মেম্বার নুরুল হুদা সাড়ে ৩ কোটি টাকার সম্পদ। তার ভাই নুরুল কবিরের সম্পদ পাওয়া গেছে ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকার সম্পদ, আবদুল্লাহ নামে অপর এক কারবারির সম্পদ রয়েছে ১ কোটি টাকার। টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের মেম্বার মাহমুদুর রহমানের নামে-বেনামে আছে ২ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ, টেকনাফ পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মনিরুজ্জামানের ৩ কোটি টাকার সম্পদ, তার আরেক ভাই জাফর আলমের অন্তত ১০ কোটির টাকার সম্পদ, পৌরসভার বাসিন্দা আবদুর রহিমের নামে-বেনামে ১ কোটি টাকার সম্পদ, পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নুরুল বশরের নামে-বেনামে আছে ১ কোটি টাকার সম্পদ, পৌর কাউন্সিলর কোহিনুর বেগমের স্বামী শাহ আলমের নামে ৪০ লাখ, আলী আহমদ চেয়ারম্যানের ছেলে আবদুর রহমানের ৩০ লাখ, টেকনাফ সদর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার এনামুল হকের নামে ৩৫ লাখ, আরেক মেম্বার শামসুল আলমের নামে ৪০ লাখ, সাবেক মেম্বার বকতার আহমেদের নামে ৫০ লাখ, টেকনাফের নাজিরপাড়ার এজাহার মিয়ার ছেলে নুরুল হক ভুট্টুর নামে ৬০ লাখ, নুরুল হোসাইনের নামে ৩০ লাখ, নাইট্যংপাড়ার মৃত আবদুল খালেকের ছেলে ইউনুসের নামে ৩০ লাখ, দক্ষিণ হ্নীলার ফকির চন্দ্র ধরের ছেলে নির্মল ধরের নামে ২০ লাখ ও টেকনাফের দক্ষিণ জালিয়াপাড়ার বোরহান উদ্দিনের নামে ২০ লাখ টাকার সম্পদ আছে বলে দুদক নিশ্চিত হয়েছে।

বাজেয়াপ্ত করার আইনে যা আছে : মাদক কারবারের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ-সম্পত্তি ‘মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন’ এবং ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন’ এর আওতায় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বাজেয়াপ্ত করার বিধান রয়েছে। সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট বিভিন্ন সময়ে বেশ কয়েকজন গডফাদারের শত কোটি টাকার সম্পদ ক্রোক (ফ্রিজ) করার আদেশও এনেছিল। কিন্তু মাঠপর্যায়ে গিয়ে দেখা গেছে, এই ক্রোক প্রক্রিয়ার সিংহভাগই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। এই নিয়ে পুলিশের একটি ইউনিট গোপন প্রতিবেদন দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, আলিশান বাড়ি বা মার্কেটগুলোর দখল এখনো মাদক কারবারিদের আত্মীয়-স্বজন বা তাদের সহযোগীদের হাতেই রয়েছে। সুনির্দিষ্ট সেল না থাকায় সরকারের কোনো সংস্থাই তদারকি করতে পারছে না। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার আগেই কারবারিরা হুন্ডি ও বেনামি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে টাকা দেশের বাইরে পাচার করে দেওয়ার তথ্য মিলেছে। টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আওয়ামী লীগের আমলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পর কিছুদিন এই প্রাসাদসম বাড়িগুলো জনশূন্য ছিল। মাস ছয়েকের পরই তারা ফিরে এসে বাড়িগুলোতে বসবাস করছেন। তাদের রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থের দাপটের সামনে স্থানীয় প্রশাসনও অনেক সময় নীরব ভূমিকা পালন করে। আওয়ামী লীগের আমলে যারা এসব অপকর্ম করত তারা এখন বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে আঁতাত করে কারবার চালাচ্ছেন।