সংসদে জামায়াত আমির

হাসপাতালের মেঝেতে রোগীর শুয়ে থাকার দৃশ্য লজ্জাজনক

দেশের স্বাস্থ্য খাতের করুণ চিত্র তুলে ধরে বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান মন্তব্য করেছেন, পল্লী স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে শুরু করে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বত্র ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি রোগী মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। একজন চিকিৎসক হিসেবে তিনি এই দৃশ্যকে জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক বলে অভিহিত করেন। বর্তমান স্বাস্থ্য খাত কেবল বিদেশের বিভিন্ন মডেলের অন্ধ অনুকরণ বা ‘কপি অ্যান্ড পেস্ট’ পদ্ধতিতে চলছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। এই জোড়াতালির ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে শতভাগ রোগী-কেন্দ্রিক সেবা নিশ্চিত করার ওপর তিনি সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, নতুন অবকাঠামো তৈরির চেয়ে বিদ্যমান হাসপাতালের জনবল সংকট নিরসন এবং লজিস্টিক সাপোর্টের মানোন্নয়ন এখন সময়ের দাবি।

জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি আরও বলেন, দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো দুর্নীতি এবং জবাবদিহিতার অভাব। তিনি প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাসের মতো বাজেট অপচয় ও লুটপাটের পূর্বাভাস পাওয়ার সক্ষমতা তৈরির প্রস্তাব দেন। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল জাতি সঠিক সুফল পেতে পারে বলে তিনি দৃঢ় বিশ্বাস ব্যক্ত করেন।

শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড হিসেবে আখ্যায়িত করে ড. শফিকুর রহমান বলেন, অসংখ্য পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থাকা সত্ত্বেও বৈশ্বিক শিক্ষা র‍্যাংকিংয়ে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত হতাশাজনক। তিনি দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের মূল্যায়নের পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রাধান্যকে শিক্ষার দুর্দশার জন্য দায়ী করেন। বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার বিশাল জনগোষ্ঠীকে জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে সরকারের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনার অভাব রয়েছে বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি কওমি শিক্ষা ব্যবস্থার স্বকীয়তা বজায় রেখে হাইয়াতুল উলইয়ার সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে সরকারি সহযোগিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। এছাড়াও ইবতেদায়ী মাদ্রাসা এবং এমপিওভুক্তির অপেক্ষায় থাকা শিক্ষকদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি একটি নিরপেক্ষ কমিটির মাধ্যমে দ্রুত সমস্যা সমাধানের দাবি জানান।

পাহাড়ের অনগ্রসর ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কথা তুলে ধরে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, তাদেরকে শিক্ষা, যোগাযোগ ও স্বাস্থ্য সেবার মূল ধারায় অন্তর্ভুক্ত করতে না পারলে জাতীয় সংহতি সুসংহত হবে না। তিনি গবেষণাধর্মী শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়ে অন্তত পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশেষ অ্যাসাইনমেন্ট ও অতিরিক্ত ফান্ড প্রদানের প্রস্তাব দেন। এর মাধ্যমে দেশ কেবল আমদানি-নির্ভর না হয়ে নিজস্ব পণ্য রপ্তানির সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

অর্থনৈতিক সংস্কার ও রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে ড. শফিকুর রহমান একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের তিন স্তরের করের বোঝা থেকে মুক্তি দিয়ে একটি স্বচ্ছ কর কাঠামো প্রদান করলে সৎ ব্যবসায়ীরা কর প্রদানে স্বপ্রণোদিত হবেন। সরকারি কর্মকর্তাদের অনিয়ম ও চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য বন্ধ না করলে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব। তিনি বিগত ১৫ বছরে দেশ থেকে পাচার হওয়া ২৮ লক্ষ কোটি টাকা ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারকে কঠোর ও দ্রুত আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, পাচার হওয়া অর্থের মাত্র নয় ভাগের এক ভাগ উদ্ধার করতে পারলেই দেশের বাজেট ঘাটতি দূর করা সম্ভব।

সবশেষে তিনি রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে দেশের স্বার্থে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনার আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় সরকার ও বিরোধী দল কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে প্রস্তুত বলে তিনি জানান। তবে এর জন্য প্রয়োজন সরকারের সৎ সদিচ্ছা এবং অপরাধীদের দেশে এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা। অন্যথায় ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের লুটপাটের শঙ্কা থেকে যাবে বলে তিনি হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন।