কবি, কথাসাহিত্যিক ও বহুল আলোচিত দীর্ঘ কবিতা ‘নিরঞ্জন আমার বন্ধুর নাম’-এর রচয়িতা আশরাফুল ইসলাম ভাস্কর চৌধুরী আর নেই। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। রবিবার রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে রাজধানীর হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
সোমবার (২৯ জুন) বিকালে রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার ভবানীপুরে নিজ গ্রামের বাড়িতে তৃতীয় জানাজা শেষে চাঁনহাজিপাড়া পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-মায়ের কবরের পাশে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়েসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। পরিবার নিয়ে তিনি ঢাকার উত্তর আদাবরস্থ ঢাকা হাউজিং এলাকায় নিজস্ব বাড়িতে থাকতেন।
তিনি নীলফামারী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি তাহমিন হক ববীর আপন বোন জামাই ও দৈনিক দেশ রূপান্তর এর নীলফামারী প্রতিনিধি ইনজামাম-উল-হক নির্ণয় আপন ফুপা।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ১৫ জুন শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর থেকেই তিনি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরীক্ষায় তার খাদ্যনালীতে টিউমার ধরা পড়ে। এর পাশাপাশি ফুসফুসে পানি জমা এবং দীর্ঘদিনের উচ্চমাত্রার ডায়াবেটিসজনিত জটিলতায় তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। সবশেষে চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।
তার ছোট ভাই চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. জিয়াউল আহসান জাকারিয়া মুক্তা জানান, এর আগে রবিবার রাতে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে প্রথম জানাজা এবং সোমবার ভোরে ঢাকার উত্তর আদাবরের বাসভবনের কাছে ঢাকা হাউজিং জামে মসজিদে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। আমার বড় ভাইয়ের শেষ ইচ্ছে ছিল তাকে বাবা ও মায়ের পাশেই কবর দেয়া হয়। বড় ভাইয়ের শেষ ইচ্ছে আমরা পূরণ করেছি।
ভবানীপুরে অনুষ্ঠিত তৃতীয় জানাজায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আলমগীর স্বপন, সাহিত্য সংগঠন হৃথিবী রথের আনিফ রুবেদ, বাংলাদেশ সাহিত্যপ্রেমী পরিষদের ওমর ফারুক, আত্মীয়-স্বজন এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। এ সময় শোকাহত স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীরা তাকে শেষ বিদায় জানান।
পারিবারিক সূত্র জানায়, ১৯৫২ সালের ১৭ নভেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন ভাস্কর চৌধুরী। ছাত্রজীবন থেকেই গল্প, উপন্যাস ও কবিতায় তিনি নিজস্ব ভাষা ও বর্ণনাশৈলীতে স্বতন্ত্র সাহিত্যভুবন নির্মাণ করেন। ৪০টির অধিক গল্প, কবিতা ও উপন্যাস লিখে দেশের একজন স্বনামধন্য কবি ও সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত অর্জন করেন তিনি। তবে তার লিখা গুলো প্রকাশ পেতো ভাস্কর চৌধুরী নামে। এই নামেই তিনি বিশেষভাবে পরিচিত।
তার রচিত দীর্ঘ কবিতা ‘নিরঞ্জন আমার বন্ধুর নাম’ দুই বাংলার আবৃত্তি অঙ্গনে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। সেই কবিতায় একটি লাইনে তিনি লিখেছিলেন “সব-চে খাঁটি এ দেহ ধুলো আর মাটি”।।
এছাড়া ‘রক্তপাতের ব্যাকরণ’, ‘লালমাটি কালো মানুষ’ এবং সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর জীবন, সংস্কৃতি ও সংগ্রাম নিয়ে ‘ধনসা মাতি ও তার জীবনবৃক্ষ’ সহ অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি। বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটি, মানুষ, লোকজ সংস্কৃতি এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রাম তার সাহিত্যকর্মের প্রধান উপজীব্য ছিল।
তার মৃত্যুতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নীলফামারীসহ দেশের সাহিত্যাঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অনেক সাহিত্যপ্রেমী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও শুভানুধ্যায়ী তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে।
তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: রক্তপাতের ব্যাকরণ (১৯৮৪-গল্পগ্রন্থ), বাষট্টি বিঘা নদী (১৯৮৭-গল্পগ্রন্থ), কোথায় নিবাস (১৯৮৭-গল্পগ্রন্থ), পতনের সময় (১৯৮৮-গল্পগ্রন্থ), শনিবারে বৃষ্টি (১৯৯৯-গল্পগ্রন্থ), লালমাটি কালো মানুষ (১৯৯৮-উপন্যাস), স্বপ্নপুরুষ (১৯৯৮-উপন্যাস). মীমাংসা পর্ব (১৯৯৮-উপন্যাস) আষাড়ের জীবনদর্শণ (১৯৯৯-উপন্যাস) ভূমি (২০১১- উপন্যাস), কৃষ্ণপুরাণ (২০১১-উপন্যাস), কখনও কখনও এরকম ঘটে (২০১২-উপন্যাস)। আমার কেবলই সমর্পণ (১৯৮৬-কবিতা), নিরঞ্জন আমার বন্ধুর নাম (২০১২-কবিতা), আমার ভেতরে আঁধার (২০১২-কবিতা), পরাণের গহীন (২০১২-কবিতা), তোর বড় কষ্টরে (২০১২-কবিতা) প্রভৃতি তার প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য মৌলিক সৃষ্টিশীল গ্রন্থ।