১১ বছর আগের ধারায় পাবলিক পরীক্ষা

পাবলিক পরীক্ষায় ১১ বছর আগের ধারায় ফিরছে শিক্ষা বোর্ডগুলো। ২০১৫ সাল থেকে বোর্ডভিত্তিক ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্নপত্রে পাবলিক পরীক্ষা শুরু হলেও এবার থেকে একই প্রশ্নপত্রে দেশের সব বোর্ডে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। অর্থাৎ সারা দেশের পরীক্ষার্থীরা একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দেবে এবং তাদের মেধার মূল্যায়নও একই হবে। দেশের ৮টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ১০ লাখ ৬৯ হাজার ৭১৪ এবং মাদ্রাসা বোর্ডের ৯২ হাজার ৯০৫ ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ১ লাখ ৭ হাজার ৯৬৪ পরীক্ষার্থী আজ বৃহস্পতিবার থেকে অংশ নিচ্ছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায়।

২০১৪ এবং এর আগের পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায়ই প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটত। আর প্রশ্নপত্র ফাঁস হলেই সারা দেশের পাবলিক পরীক্ষা বাতিল হয়ে যেত। এতে পরীক্ষার্থীরা যেমন বিড়ম্বনার শিকার হতো তেমনিভাবে পরীক্ষা পরিচালনায়ও সমস্যা হতো। দেশের কোনো একটি এলাকায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে সারা দেশের পাবলিক পরীক্ষা বাতিল হয়ে যাওয়ার পর এই পদ্ধতির বিরুদ্ধে প্রশ্ন ওঠে। আর এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালের পাবলিক পরীক্ষা থেকে দেশের ৮টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডকে প্রশ্নপত্র প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়। আর তখন থেকেই শিক্ষা বোর্ডগুলো ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা গ্রহণ শুরু করে। ২০১৫ সালে ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষার পর ২০১৮ সালে দেশের শিক্ষা বোর্ডগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করে দুই ধরনের প্রশ্নপত্র করা হয়েছিল। এরপর ২০১৯ থেকে আবারও সব বোর্ডে ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা শুরু হয়।       

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এবারের এইচএসসি পরীক্ষা থেকে আমরা সারা দেশে একই প্রশ্নপত্রে (অভিন্ন) পরীক্ষা নিতে যাচ্ছি। আমাদের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।’ এর আগে শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন ঘোষণা দিয়েছিলেন পরীক্ষার সময় এগিয়ে নিয়ে আসা এবং অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত করার বিষয়ে।

১১ বছর পর আবারও অভিন্ন প্রশ্নপত্র কেন? : আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামানের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল ১১ বছর পর আবারও অভিন্ন প্রশ্নপত্রে সরকার পাবলিক পরীক্ষা কেন নিতে শুরু করল। এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একটি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রিন্ট করতে বিজি প্রেসের কমপক্ষে ১৮ থেকে ২০ দিন সময় লাগে। তাহলে ৮টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের প্রশ্নপত্র প্রিন্ট করতে কত দিন লাগবে? শুধু কি এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র? এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র রয়েছে, জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র রয়েছে। প্রশ্নপত্র প্রিন্টের বিশাল এই কর্মযজ্ঞের কারণে চাইলেও সরকারের পক্ষে পরীক্ষার সময় এগিয়ে আনা সম্ভব ছিল না। আর তাই আমরা অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নিয়ে পরীক্ষার সময়কে এগিয়ে আনতে চাই।

শুধু কি পরীক্ষার সময় এগিয়ে আনা? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিজি প্রেস থেকে পরীক্ষার কেন্দ্র পর্যন্ত প্রশ্নপত্র পৌঁছে দিতে যে ব্যবস্থাপনা তা অভিন্ন প্রশ্নপত্রে সহজতর হয়। একই সঙ্গে সারা দেশে একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হলে মেধার মূল্যায়নও একই হবে। তখন আর কেউ বলতে পারবে না এই বোর্ডের প্রশ্ন সহজ হয়েছে, অপর বোর্ডের প্রশ্ন কঠিন হয়েছে।

কিন্তু দেশের কোথাও প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে কিংবা বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে সারা দেশের পরীক্ষা বাতিল করতে হবে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘সারা দেশের প্রশাসন ও পরীক্ষা পরিচালনায় যারা নিয়োজিত রয়েছে তারা এত বেশি অ্যালার্ট রয়েছে যে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কোনো সুযোগ নেই। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগও তেমন বিড়ম্বনা করবে না বলে মনে হচ্ছে।’

কীভাবে হয়েছে প্রশ্নপত্র : দেশের ৮টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের প্রতিটি বোর্ড তিন থেকে চারটি বিষয়ের দুটি সেট করে প্রশ্নপত্র জমা দিয়েছে। এতে বিভিন্ন বোর্ড থেকে আসা প্রশ্নপত্রগুলো থেকে লটারির মাধ্যমে দুটি প্রশ্নপত্র বাছাই করা হয়। এই দুটি প্রশ্নপত্রকে দুটি সেট কোডে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি নির্ধারিত সেট কোডে সারা দেশে পরীক্ষা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, ‘কোন বোর্ডের প্রশ্নপত্রে কোন বিষয়ের পরীক্ষা হচ্ছে তা কেউ জানার সুযোগ নেই। এতে সব প্রশ্ন একটি বোর্ড থেকে হয় না, বিভিন্ন বোর্ড থেকে পাওয়া প্রশ্নগুলো থেকে লটারির মাধ্যমে বাছাই করা হয়।’

এবার থাকবে নমুনা উত্তরপত্র : যেহেতু ১১ বছর পর অভিন্ন প্রশ্নপত্রে আবারও পরীক্ষা শুরু হচ্ছে, এতে উত্তরপত্র মূল্যায়ন কেমন হতে পারে? কিংবা কোনো পরিবর্তন আসবে কি না? এসব বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, এবার আমরা ঢাকা বোর্ড থেকে একটি নমুনা উত্তরপত্র সংগ্রহ করছি। সেই উত্তরপত্র পরীক্ষকদের কাছে সরবরাহ করব। এতে উত্তরপত্র মূল্যায়ন ইউনিক হবে।

উত্তরপত্র মূল্যায়ন নিয়ে জানতে কথা হয় গত ২৯ বছর ধরে পরীক্ষকের দায়িত্ব পালন করা চট্টগ্রাম বন্দর কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের অধ্যাপক হাবিবুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, গত বছরও আমি প্রধান পরীক্ষকের দায়িত্বে ছিলাম। উত্তরপত্র মূল্যায়নের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি ভিন্ন বা অভিন্ন যেকোনো প্রশ্নেই পরীক্ষা হোক না কেন উত্তরপত্র মূল্যায়নে পরীক্ষকদের মধ্যে ভিন্নতা থাকবে। তবে এই ভিন্নতা যাতে বেশি না হয় সেজন্য বোর্ড থেকে একটি নির্দেশনা দেওয়া হয়। এবার হয়তো এটা সরবরাহ করা হবে।

সারা দেশে এবার ১২,৭০,৫৮৩ জন পরীক্ষা দিচ্ছে : এদিকে আজ থেকে শুরু হতে যাওয়া এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় দেশের ৮টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড এবং মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের আওতায় ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে ৮টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ১০ লাখ ৬৯ হাজার ৭১৪ জন, মাদ্রাসা বোর্ডে ৯২ হাজার ৯০৫ জন ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ১ লাখ ৭ হাজার ৯৬৪ জন পরীক্ষা দিচ্ছে। ৮টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে ঢাকা বোর্ডে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে ৩ লাখ ৩৯৩ জন। এ ছাড়া রাজশাহী বোর্ডে ১ লাখ ৪০ হাজার ৮৩০ জন, কুমিল্লা বোর্ডে ৯৪ হাজার ৮০২ জন, যশোর বোর্ডে ১ লাখ ১৭ হাজার ২১০ জন, চট্টগ্রাম বোর্ডে ৯৯ হাজার ৬৮৮ জন, বরিশাল বোর্ডে ৫৮ হাজার ৬৬৪ জন, সিলেট বোর্ডে ৭১ হাজার ৬১১ জন, দিনাজপুর বোর্ডে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৭৯ জন ও ময়মনসিংহ বোর্ডে ৭৩ হাজারে ৩৭ জন।   

উল্লেখ্য, গত এসএসসি পরীক্ষার মতো এইচএসসি পরীক্ষায়ও কেন্দ্রগুলোতে সিসি ক্যামেরা থাকবে। কেন্দ্রীয়ভাবে এগুলো মনিটরিং করা হবে। এ ছাড়া কেন্দ্রগুলো যাতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে সেই নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।