ট্রফি চাই এমবাপ্পের

বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের অদম্য বাসনা আর বিশ্বমঞ্চে রেকর্ডের পাতায় লিওনেল মেসিকে ছোঁয়া সবই যেন এক সুতোয় গেঁথে নিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। নিউইয়র্কের নিউজার্সি স্টেডিয়ামের ৮৬ হাজারের বেশি দর্শককে মন্ত্রমুগ্ধ করে সুইডেনকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে ফ্রান্স। ফরাসি অধিনায়কের জোড়া গোল আর মাইকেল অলিসের জাদুকরী নৈপুণ্যে ভর করে অনায়াসে শেষ ষোলোর টিকিট কেটেছে দিদিয়ের দেশমের দল। এই জয়ে ফরাসিদের আক্রমণাত্মক ফুটবলের ধার এতটাই নিখুঁত ছিল যে, একে কেবলই ‘চ্যাম্পেইন ফুটবল’ বা রাজকীয় প্রদর্শনীর সঙ্গেই তুলনা করা চলে।

ম্যাচে জোড়া গোল করে চলতি বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির সমান ৬ গোল নিয়ে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এখন শীর্ষে ফরাসি অধিনায়ক। তবে এর চেয়েও বড় কীর্তি হলো মাত্র বিশ্বকাপের ১৮টি ম্যাচ খেলে এমবাপ্পের মোট গোল সংখ্যা এখন ১৮। তিনি এখন মিরোসøাভ ক্লোসাকে ছাড়িয়ে বিশ্বমঞ্চের সর্বকালীন সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় এককভাবে দ্বিতীয় স্থানে। মেসির ১৯ গোলের সর্বকালীন রেকর্ড ছুঁতে তার প্রয়োজন আর মাত্র ১ গোল। তবে রেকর্ড নিয়ে নয়, এমবাপ্পের ভাবছেন অন্য কিছু। ম্যাচশেষে তিনি বলেন,  ‘আমি আগেও বলেছি, আমাদের লক্ষ্য হলো যতটা সম্ভব দূর যাওয়া ১৯ জুলাইয়ের ফাইনালে খেলা এবং ট্রফি নিয়ে এখানে ফিরে আসা। আমরা ম্যাচ বাই ম্যাচ এগোচ্ছি। অবশ্যই আপনি যত বেশি গোল করবেন, তালিকায় তত ওপরে উঠবেন। এটা নতুন কিছু নয়।’

মেসির প্রতি সম্মান জানিয়ে এমবাপ্পে আরও যোগ করেন, ‘আমি নিশ্চিত যে লিও (মেসি) এ টুর্নামেন্টে আরও গোল করতে যাচ্ছে। তাই আমি ব্যক্তিগত এসব সংখ্যা নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামাচ্ছি না। আমার  পুরো মনোযোগ পরবর্তী প্রতিপক্ষ এবং আমাদের মূল লক্ষ্য অর্থাৎ ফাইনালের দিকে।’ ২০২২ বিশ্বকাপ ৮ গোল নিয়ে গোল্ডেন বুট জিতলেও মেসির কাছে ফাইনালে হেরে যান এমবাপ্পে।

ম্যাচের ৪৫ মিনিটে উসমান দেম্বেলের পাস থেকে সুইডিশ ডিফেন্ডারদের বোকা বানিয়ে প্রথম গোলটি করেন এমবাপ্পে। এই দেম্বেলে-এমবাপ্পে জুটি এখন বিশ্বকাপে যৌথভাবে ছয়টি গোল বানিয়ে ইতিহাস গড়েছেন, যা জার্মানির বালাক-ক্লোসা জুটিকে ছাড়িয়ে গেছে। গোলটি করার পরই পুরো দল নিয়ে ডাগআউটের দিকে ছুটে যান এমবাপ্পে। মায়ের শেষকৃত্য সম্পন্ন করে সদ্যই দলের সঙ্গে যোগ দেওয়া কোচ দিদিয়ের দেশমকে পরম আবেগে জড়িয়ে ধরেন তিনি। ১৪ বছর ধরে দায়িত্বে থাকা দেশমের বিদায়ী বিশ্বকাপকে স্মরণীয় করে রাখতেই যেন ফরাসি শিবিরের এ নিবেদন।

ম্যাচজুড়ে যদি এমবাপ্পে নায়ক হন, তবে পর্দার পেছনের মূল কারিগর ছিলেন অলিস। বায়ার্ন মিউনিখের এ তারকা প্রথমার্ধে প্রায় ৩০ গজ দূর থেকে এক চোখধাঁধানো ওভারহেড বাইসাইকেল কিক নিয়েছিলেন, যা পোস্টে লেগে ফিরে আসে। গোল না পেলেও পুরো ম্যাচে দুটি অ্যাসিস্ট করে সুইডেন-বধের রূপরেখা গড়েন তিনি। ম্যাচের ৫৩ মিনিটে অলিসের ডিফেন্ডারদের পায়ের ফাঁক দিয়ে দেওয়া নিখুঁত পাস থেকেই ব্যবধান ২-০ করেন পিএসজি উইঙ্গার ব্র্যাডলি বারকোলা। এরপর ৭৪ মিনিটে তার আরেকটি মাপা থ্রু-বল ধরে বক্সে ঢুকে নিজের জোড়া গোল পূর্ণ করেন এমবাপ্পে। ৮৪ মিনিটে যখন এমবাপ্পেকে তুলে নেওয়া হয়, পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে এ জাদুকরী পারফরম্যান্সকে হাততালিতে অভিবাদন জানায়।

১৯৯০ সালের পর বিশ্বকাপে এটিই সুইডেনের সবচেয়ে দ্রুততম বিদায়। ম্যাচের উত্তাপ আর ফরাসিদের একের পর এক পাসের পসরা দেখে সুইডিশ ফুটবলারদের মাঠেই ক্লান্ত ও রেড-ফেসড দেখাচ্ছিল। ম্যাচশেষে সুইডেনের হেড কোচ গ্রাহাম পটার অকপটে স্বীকার করেন ফরাসিদের শ্রেষ্ঠত্ব। তিনি বলেন, ‘এই ম্যাচে আমাদের শতভাগ নিখুঁত ফুটবল খেলতে হতো। কিন্তু আমি যদি পুরোপুরি সৎভাবে বলি আমরা নিখুঁত খেললেও ফ্রান্সের এই দলটিকে হারানো সম্ভব হতো কি না, তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। কারণ প্রতিপক্ষ আজ অন্য এক উচ্চতায় ছিল। এ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের চেয়ে ভালো কোনো দল আমি দেখিনি।’

প্রথমার্ধের প্রতিরোধ ভেঙে যাওয়ার হতাশা প্রকাশ করে সুইডেনের অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার ভিক্টর লিন্ডেলফ বলেন, ‘বিরতির আগে যদি আমরা ০-০ ব্যবধান ধরে রাখতে পারতাম, তবে ম্যাচের চিত্র ভিন্ন হতে পারত। কিন্তু দ্বিতীয়ার্থের শুরুতেই ওরা দ্রুত গোল পেয়ে যাওয়ায় আমাদের কাজটা আরও কঠিন হয়ে যায়। আমরা বিশ্বের অন্যতম সেরা একটি দলের মুখোমুখি হয়েছিলাম।’

সুইডেনকে বিদায় করে আগামী ৪ জুলাই ফিলাডেলফিয়াতে শেষ ষোলোর মঞ্চে প্যারাগুয়ের মুখোমুখি হবেন সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। এ ম্যাচটি ফুটবলপ্রেমীদের ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে। সেবার দেশমের অধিনায়কত্বেই প্যারাগুয়ের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে লরেন্ট ব্ল্যাঙ্কের গোল্ডেন গোলে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল ফ্রান্স। এবার ডাগআউটে দেশমকে রেখে এমবাপ্পের নতুন ফ্রান্স আরও একটি ইতিহাস লিখতে প্রস্তুত।