রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জাপানের সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপদে, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনে জাপানের অব্যাহত সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও সক্রিয় ভূমিকা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বুধবার বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জাপানের বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক সংসদীয় ভাইস মিনিস্টার শিমাদা তোমাকির নেতৃত্বে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্টসহ একটি প্রতিনিধিদল সাক্ষাৎ করতে গেলে তাদের কাছে এ সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে এ কথা জানানো হয়েছে।

প্রেস উইং জানায়, সাক্ষাৎকালে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, এমআরটি লাইনসমূহ, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালসহ জাইকার অর্থায়নে বাংলাদেশে চলমান বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ডিসেম্বরের মধ্যে শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল উদ্বোধনের লক্ষ্যে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ সম্পন্ন হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

এ ছাড়া বৈঠকে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশকে জাপানের ৩১২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সহায়তা ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার বিষয়ে জাপান ইতিবাচক সাড়া দেয়। বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে উভয় পক্ষ তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে। এ সময় জাপানি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে জাপানের পক্ষ থেকে পাঁচটি প্যাট্রল বোট প্রদান করা হবে বলে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করে।

বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপদে, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে জাপানের অব্যাহত সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও সক্রিয় ভূমিকা আশা করেন।

প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীকে জাপান সফরের আমন্ত্রণ জানায়। প্রধানমন্ত্রী সুবিধাজনক সময়ে জাপান সফরের আশা প্রকাশ করেন।

সাক্ষাতে বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং প্রধানমন্ত্রীর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. শাকিরুল ইসলাম খান।

জাপানের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি, জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ব্যুরোর পরিচালক হিরোসে আইকো, জাইকার প্রেসিডেন্ট ড. তানাকা আকিহিকো এবং জাইকার বাংলাদেশ অফিসের প্রধান প্রতিনিধি তাকাহাশি জুনকো।

তিনটি নতুন উপজেলা ও একটি থানা অনুমোদন নিকার : গতকাল বুধবার সকালে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জনপ্রশাসন সভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ‘প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি’-নিকার ১২১তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে তিনটি নতুন উপজেলা ও একটি থানা অনুমোদন দেওয়া হয়। উপজেলা তিনটি হচ্ছে চট্টগ্রামের ‘ফটিকছড়ি উত্তর’, কুমিল্লার ‘বাঙ্গরা’ এবং ময়মনসিংহের ‘দক্ষিণ গফরগাঁও’। একটি নতুন থানা হচ্ছে চট্টগ্রামের ‘হালদা’।

এ ছাড়া রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন পূর্বাঞ্চল নতুন শহর প্রকল্প এলাকার নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর জেলা প্রকল্পের অংশগুলো ঢাকার অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

নিকার প্রস্তাব অনুযায়ী, তিনটি নতুন উপজেলা হচ্ছে চট্টগ্রাম জেলা ফটিকছড়ি উপজেলার ছয় ইউনিয়ন নিয়ে ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলা, কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলাকে ভাগ করে ‘বাঙ্গরা’ এবং ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলার পাগলা থানার ৮টি ইউনিয়ন নিয়ে ‘দক্ষিণ গফরগাঁও’ উপজেলা। চট্টগ্রামের হাটহাজারি থানাকে বিভক্ত করে গঠন করা হয়েছে ‘হালদা থানা’।

তারেক রহমানের সভাপতিত্বে নিকার এ বৈঠকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আবদুস সাত্তারসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবরা উপস্থিত ছিলেন।

ডিএসসিসির সড়ক ব্যবস্থাপনাবিষয়ক সভা : বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সড়ক ব্যবস্থাপনাবিষয়ক এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে রাজধানীর যানজট নিরসনে বৃত্তাকার সড়ক ও নৌপথের কার্যকর ব্যবহারে অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়।

পরে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানায়, এ প্রকল্পের মাধ্যমে রাজধানীর যানজট নিরসন কীভাবে হবে তা বৈঠকে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীকে রাজধানীর ইনার সার্কুলার রিং রোড নির্মাণ প্রকল্পের সর্বশেষ অবস্থা অবহিত করা হয়েছে। ঢাকার ইনার সার্কুলার রিং রোড গাবতলী থেকে বাবুবাজার এবং পোস্তাগোলা থেকে ডেমরা পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে। ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পের রায়েরবাজার, হাজারীবাগ ও কামরাঙ্গীরচর অংশের নির্মাণকাজ  চলছে। এই পথে ৪৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়।

 প্রেস উইং জানায়, বৈঠকে তুলে ধরা হয় বৃত্তাকার এই রিং রোড নির্মাণ হলে ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-মাওয়া ও ঢাকা-চট্টগ্রামে যেতে রাজধানীর ভেতরের সড়কপথ ব্যবহার করতে হবে না। এতে শহরের যানবাহনে চাপ কমবে। একই সঙ্গে যানজটও কমে আসবে। একইভাবে ঢাকা শহর ঘিরে যে ১১০ কিলোমিটারের নদীপথ রয়েছে, সেটি চালু করা গেলে রাজধানীর সড়কে যানবাহনের চাপ কমবে। রাজধানীর বৃত্তাকার নদীপথে মানুষ এক গন্তব্যে থেকে অন্য গন্তবে যেতে পারবে অনায়াসে। এ বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়। বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা এর কারিগরি দিক উপস্থাপন করেন। নদীপথ ব্যবহার করলে পরিবেশ দূষণমুক্ত থাকবে, জ্বালানি সাশ্রয়ী হবে, সময়ও কম লাগবে বলে বিশেষজ্ঞরা বৈঠকে বলেছেন। কারণ নদীপথের যানবাহনগুলো হবে ইলেক্ট্রিক চালিত।

এ সময় বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব শহীদুল হাসান, সড়ক পরিবহন সচিব জিয়াউল হক, নৌপরিবহন সচিব মো. জাকারিয়া, রেলপথ সচিব ফাহমিদুল ইসলাম, বিআইডাব্লিউটিএর চেয়ারম্যান মুহিদুল ইসলাম, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী জহিরুল ইসলাম, প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো. বোরহান উদ্দিন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক খান মাহমুদ আমানত ও অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান।