জাপানি ইয়েনের রেকর্ড দরপতনে বাড়ছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শঙ্কা

জাপানের মুদ্রা ইয়েন মার্কিন ডলারের বিপরীতে ৪০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে এসেছে। এ পরিস্থিতিতে জাপান সরকার আবারও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। এমন পদক্ষেপের প্রভাব শুধু জাপানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার, ট্রেজারি বন্ডের বাজার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমানোর পরিবর্তে বর্তমান অবস্থায় রাখবে বা প্রয়োজনে আরও বাড়াতে পারে, এমন প্রত্যাশাই মূলত ইয়েনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ফেডকে কঠোর অবস্থানে থাকতে উৎসাহিত করছে। এর ফলে ডলারের চাহিদা বেড়েছে এবং ইয়েনের মূল্য আরও কমেছে।

চলতি বছরে মার্কিন ডলার সূচক প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছে। অথচ ২০২৫ সালে সূচকটি ৯ শতাংশ পর্যন্ত কমেছিল। অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য, যুদ্ধজনিত জ্বালানি সংকটই ইয়েনের দুর্বলতার সর্বশেষ বড় কারণ।

গত জুনে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ব্যাংক অব জাপান) নীতিগত সুদের হার বাড়িয়ে ১ শতাংশে উন্নীত করেছে, যা ১৯৯০-এর দশকের পর সর্বোচ্চ। তবে এটি এখনও যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের ৩ দশমিক ৫ থেকে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদের হারের তুলনায় অনেক কম। ফলে বেশি মুনাফার আশায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা যুক্তরাষ্ট্রমুখী হচ্ছেন। এতে ডলার শক্তিশালী হচ্ছে, আর ইয়েনের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।

জাপানের অর্থনীতিতে যেমন প্রভাব পড়ছে

দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে এবং মূল্যস্ফীতি ঠেকাতে জাপান অত্যন্ত নিম্ন বা শূন্যের কাছাকাছি সুদের হার বজায় রেখেছিল। তবে ২০২৪ সাল থেকে মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করায় ধীরে ধীরে সুদের হার বাড়াতে শুরু করে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

তবুও ইয়েনের অবমূল্যায়ন থামেনি। এর ফলে আমদানি করা খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়ছে। জাপান খাদ্য ও জ্বালানির বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি দেশটির অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েনের এই ধারাবাহিক পতন এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি অব্যাহত থাকলে জাপানের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাবে এবং তা অর্থনৈতিক সংকটের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

আবারও কি বাজারে হস্তক্ষেপ করবে জাপান

ইয়েনের দর স্থিতিশীল রাখতে জাপান সরকার আবারও বাজারে হস্তক্ষেপ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর জন্য সরকার ডলার বা মার্কিন ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করে ইয়েন কিনতে পারে।

এর আগে চলতি বছরের এপ্রিল ও মে মাসে প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ বিক্রি করে ইয়েনকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছিল জাপান। কিন্তু সেই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে সফল হয়নি।

যদিও বিশ্লেষকদের মতে, জাপান আরও বেশি মার্কিন ট্রেজারি বিক্রি করলেও যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল বন্ডবাজারের তুলনায় এর প্রভাব সীমিতই থাকবে।

মার্কিন শেয়ারবাজারেও পড়তে পারে প্রভাব

ওয়াল স্ট্রিটে বহু বিনিয়োগকারী কম সুদে ইয়েন ঋণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেন। অর্থনীতির ভাষায় এটিকে 'ক্যারি ট্রেড' বলা হয়।

যদি সরকারি হস্তক্ষেপে ইয়েনের মূল্য দ্রুত বেড়ে যায় এবং একই সঙ্গে জাপানে সুদের হার আরও বাড়ে, তাহলে এই ঋণ নেওয়া ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে। ফলে অনেক বিনিয়োগকারী ঋণ পরিশোধ করতে বাধ্য হয়ে শেয়ার বিক্রি শুরু করতে পারেন। এতে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার, বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।

২০২৪ সালের আগস্টেও জাপানের সুদের হার বৃদ্ধির পর একই ধরনের পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে বড় ধরনের দরপতন দেখা গিয়েছিল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের এই অস্থিরতা শুধু জাপান বা যুক্তরাষ্ট্রের বিষয় নয়। এর প্রভাব বৈশ্বিক শেয়ারবাজার, বিনিয়োগ, অবসর তহবিল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপরও পড়তে পারে।

একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করছে যে চলতি বছরে বিশ্ব অর্থনীতি কতটা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বছরের শুরুতে অধিকাংশ বিশ্লেষক ডলারের আরও দুর্বল হওয়া এবং ইয়েনের ঘুরে দাঁড়ানোর পূর্বাভাস দিলেও বাস্তবে ঘটেছে ঠিক উল্টোটা। ফলে বৈশ্বিক অর্থবাজারে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।